ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনে কখনো সুসময় আসে, আবার কখনো নেমে আসে অভাব-অনটন ও অর্থনৈতিক সংকট। আয় কমে যাওয়া, ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় অর্থের সংস্থান না হওয়া— এসব পরিস্থিতি মানুষের মনে দুশ্চিন্তা ও হতাশা তৈরি করে। অনেক সময় ঋণের চাপ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকেও কঠিন করে তোলে। তবে একজন মুমিনের উচিত বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখা এবং তার সাহায্য কামনা করা।
ইসলামে অর্থকষ্ট ও ঋণমুক্তির জন্য দোয়া, ইস্তেগফার, তাকওয়া এবং হালাল উপার্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন এবং সাহাবিদের বিভিন্ন দোয়া শিখিয়েছেন। পাশাপাশি কুরআনে আল্লাহ তাআলা অভাব দূর হওয়া ও রিজিকের বরকত লাভের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমলের নির্দেশনা দিয়েছেন।
১. ঋণমুক্তির জন্য নবীজি (সা.)-এর শেখানো বিশেষ দোয়া
ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া রয়েছে। হজরত আলী (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি ঋণমুক্তির উপায় জানতে চেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মুকাতাব দাস, যিনি নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে স্বাধীন হওয়ার চুক্তি করেছিলেন; কিন্তু সেই অর্থ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন।
তখন হজরত আলী (রা.) তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো একটি দোয়া পড়ার পরামর্শ দেন। দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার হালাল দিয়ে আমাকে এমনভাবে যথেষ্ট করে দিন, যাতে হারামের প্রয়োজন না হয়। আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখুন।’ (তিরমিজি ৩৫৬৩)
হজরত আলী (রা.) ওই ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করে বলেন, এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেবেন, এমনকি তার ঋণ সীর পর্বতের সমান হলেও।
এই দোয়ায় একজন মুমিনের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, আল্লাহ যেন হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অভাব দূর করে দেন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ যেন তার অনুগ্রহে মানুষের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত রাখেন।
২. দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির দোয়া
অর্থকষ্ট শুধু আর্থিক সমস্যাই তৈরি করে না, অনেক সময় তা মানুষের মানসিক প্রশান্তিও কেড়ে নেয়। ঋণ পরিশোধের চিন্তা, সংসারের ব্যয় নির্বাহের চাপ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মানুষকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখিয়েছেন। তিনি নিয়মিত এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আঝযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল ঝুবনি, ওয়া দালাইদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা, অক্ষমতা ও অলসতা, কৃপণতা ও ভীরুতা, ঋণের ভার এবং মানুষের কাছে পরাভূত হওয়া থেকে।’ (বুখারি ৬৩৬৯)
এই দোয়ায় শুধু ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি চাওয়া হয়নি; বরং দুশ্চিন্তা, অক্ষমতা, অলসতা ও মানুষের কাছে অপদস্থ হওয়া থেকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আর্থিক সামর্থ্যের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা ও কর্মস্পৃহাও প্রয়োজন।
৩. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা
অভাব-অনটন থেকে মুক্তি ও রিজিকে বরকত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো বেশি বেশি ইস্তেগফার করা। ইস্তেগফার অর্থ আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। একজন মুমিনের জীবনে এটি শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
পবিত্র কুরআনে হজরত নুহ (আ.)-এর বক্তব্য তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا
‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদীনালা সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নুহ: আয়াত ১০-১২)
এই আয়াতগুলোতে ইস্তেগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও নেয়ামত বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত নিয়মিত ইস্তেগফার করা, নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
বিশেষ করে অর্থকষ্টের সময় হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তেগফারে মনোযোগী হওয়া উচিত। তবে ইস্তেগফারকে সম্পদ বৃদ্ধির কোনো যান্ত্রিক নিশ্চয়তা মনে করা যাবে না; বরং এটি আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের একটি ইবাদত।
৪. তাকওয়া অবলম্বন ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা
রিজিকের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তাকওয়া অবলম্বন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকওয়া অর্থ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। আর তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ২-৩)
এই আয়াত একজন মুমিনকে আশাবাদী হতে শেখায়। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়া কিংবা আল্লাহর বিধান অমান্য করা উচিত নয়। বরং সব অবস্থায় হালাল পথে থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং বৈধ উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পাশাপাশি ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
৫. হালাল উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া
ইসলাম শুধু দোয়া ও ইবাদতের নির্দেশ দেয়নি; বরং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতেও উৎসাহিত করেছে। তাই অর্থকষ্টে পড়লে শুধু দোয়া করে বসে থাকলে চলবে না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ ও উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
- অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী খরচ কমিয়ে আনতে হবে।
- আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি করে সামর্থ্য অনুযায়ী বাজেট করতে হবে।
- ঋণ থাকলে তা পরিশোধের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে।
- ঋণদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন হলে পরিশোধের সময় বা কিস্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
- নতুন দক্ষতা অর্জন করে উপার্জনের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।
- সুদ, প্রতারণা ও অন্যায় উপায়ে অর্থ উপার্জন থেকে বিরত থাকতে হবে।
ঋণ পরিশোধের আন্তরিক ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ
‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার ইচ্ছা রাখে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (বুখারি ২৩৮৭)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ত ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পরিশোধের আন্তরিক ইচ্ছা রাখতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তা পরিশোধের চেষ্টা করতে হবে।
অর্থকষ্ট ও ঋণের বোঝা মানুষের জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। তবে এ অবস্থায় হতাশ হয়ে পড়া কিংবা হারাম উপার্জনের পথ বেছে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং আল্লাহর কাছে দোয়া করা, নিয়মিত ইস্তেগফার করা, তাকওয়া অবলম্বন করা এবং হালাল উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের করণীয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো ঋণমুক্তির দোয়া ও দুশ্চিন্তা থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া নিয়মিত পড়ার পাশাপাশি নিজের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। কখন, কীভাবে এবং কোন পথে তিনি বান্দার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করবেন, তা মানুষের জ্ঞানের বাইরে। তাই বিপদ যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। দোয়া, তওবা, হালাল চেষ্টা ও আল্লাহর ওপর ভরসা—এই চারটি বিষয়কে জীবনের অংশ করে নিতে পারলেই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় একজন মুমিন সঠিক পথের সন্ধান পাবেন।

