মৃত্যুর পরও যেসব কারণে আমলনামায় গুনাহ জমা হতে থাকে
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত্যু মানুষের দুনিয়ার জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু তার সব কাজের প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া কথা, শিক্ষা, আদর্শ, প্রচলিত প্রথা কিংবা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো পাপের প্রভাব বছরের পর বছর চলতে পারে। জীবদ্দশায় কেউ এমন কোনো ভালো কাজের সূচনা করে গেলে, যার সুফল মানুষ মৃত্যুর পরও ভোগ করে, তাহলে সে সওয়াব পেতে থাকে। বিপরীতে, কেউ যদি এমন কোনো অন্যায় বা পাপের পথ চালু করে যায়, যা পরবর্তী সময়ে অন্যরা অনুসরণ করে, তাহলে তাদের পাপের অংশও তার আমলনামায় যুক্ত হতে পারে।
এ কারণে একজন মুমিনের শুধু নিজের বর্তমান আমল নিয়েই সচেতন থাকলে চলবে না; বরং মৃত্যুর পর পৃথিবীতে তার রেখে যাওয়া কাজের প্রভাব কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে। কারণ, মৃত্যুর পর মানুষের আমলনামা বন্ধ হলেও তার রেখে যাওয়া কিছু কাজের হিসাব চলতে থাকে।
মৃত্যুর পরও যে আমলের হিসাব চলতে থাকে
মানুষ মারা গেলে তার নিজের পক্ষ থেকে নতুন আমল করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু আমলের প্রতিদান মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। এ বিষয়ে
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল ছাড়া—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম ১৬৩১)
এই হাদিসে মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের জীবদ্দশায় করা এমন কিছু কাজের প্রভাব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বিষয়টি শুধু ভালো কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেউ যদি অন্যায় ও পাপের কোনো পথ তৈরি করে যায় এবং পরবর্তী সময়ে মানুষ তা অনুসরণ করতে থাকে, তাহলে সেই পাপের দায়ও তার ওপর আসতে পারে।
মানুষের রেখে যাওয়া কাজও আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে
মানুষের নিজের কৃতকর্মের পাশাপাশি তার রেখে যাওয়া প্রভাবও আল্লাহর অজানা নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ ۚ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ
‘নিশ্চয় আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তারা আগে যা পাঠিয়েছে ও যা পেছনে রেখে গেছে, আমি প্রত্যেক বিষয়কে সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।’ (সুরা ইয়াসিন: আয়াত ১২)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের জীবদ্দশায় করা কাজের পাশাপাশি তার রেখে যাওয়া প্রভাবও আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে। কোনো ভালো কাজের প্রভাব যেমন মৃত্যুর পরও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তেমনি কোনো মন্দ কাজের প্রভাবও পরবর্তী সময়ে মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অন্যকে বিভ্রান্ত করার পাপও বহন করতে হবে
যারা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কঠিন পরিণতির কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ
‘ফলে কিয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা, যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে। জেনে রাখো, তারা যা বহন করবে তা কতই না নিকৃষ্ট!’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ২৫)
অন্য আয়াতেও আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَّعَ أَثْقَالِهِمْ ۖ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ
‘তারা অবশ্যই বহন করবে নিজেদের বোঝা এবং নিজেদের বোঝার সঙ্গে আরও কিছু বোঝা। আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত, সে সম্পর্কে কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ১৩)
অন্যকে পাপের পথে পরিচালিত করার দায় শুধু নিজের অপরাধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং নিজের প্ররোচনা ও বিভ্রান্তির কারণে অন্যরা যে পাপে জড়ায়, তার দায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তাতে পারে।
পাপের ধারাবাহিক দায় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবার্তা
মানুষের মৃত্যুর পরও তার প্রচলিত কোনো মন্দ কাজের কারণে গুনাহ জমা হতে থাকে— এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ، وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ
‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো প্রথার প্রচলন করে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং যারা পরবর্তীতে সে অনুযায়ী আমল করবে, তাদের প্রতিদানের সমপরিমাণ সওয়াবও পাবে। এতে তাদের সওয়াবের কোনো কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ প্রথার প্রচলন করে, তার ওপর এর গুনাহ বর্তাবে এবং যারা পরবর্তীতে সে অনুযায়ী আমল করবে, তাদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহও তার ওপর বর্তাবে। এতে তাদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না।’ (মুসলিম ১০১৭)
এই হাদিসের প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত শিক্ষণীয়। একবার দরিদ্র লোকদের অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সদকা করতে উৎসাহিত করেন। তখন একজন সাহাবি এগিয়ে এসে সদকা করলে অন্যরাও তাকে অনুসরণ করে দান করতে শুরু করেন। এ ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালো কাজের সূচনা করার প্রতিদান এবং মন্দ কাজের প্রচলনের পরিণতি সম্পর্কে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেন।
কেউ ভালো কাজের পথ তৈরি করলে পরবর্তী সময়ে যারা সেই পথে চলবে, তাদের সওয়াবের সমপরিমাণ সওয়াবও সে পাবে। একইভাবে কেউ মন্দ কাজের প্রচলন করলে তার অনুসরণকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহও তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا، وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا
‘যে ব্যক্তি মানুষকে সৎপথের দিকে আহ্বান করে, সে তার অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। এতে তাদের সওয়াবের কোনো কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি মানুষকে ভ্রান্ত পথের দিকে আহ্বান করে, তার ওপর তার অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে। এতে তাদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না।’ (মুসলিম ২৬৭৪)
হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রেও এই নীতির একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الْأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا، لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ
‘অন্যায়ভাবে যখনই কোনো মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন তার রক্তপাতের পাপের একটি অংশ আদমের প্রথম সন্তানের ওপরও বর্তায়। কারণ, সেই-ই প্রথম হত্যার প্রচলন করেছিল।’ (বুখারি ৩৩৩৫)
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, মানুষের কাজের প্রভাব অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সেই প্রভাবের দায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর আসতে পারে। তাই কোনো কাজ শুরু করা, প্রচার করা কিংবা অন্যকে তাতে উৎসাহিত করার আগে তার পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
যেসব কারণে মৃত্যুর পরও গুনাহ জমা হতে পারে
মানুষের কথা, কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে অনেক সময় পাপের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। বিশেষ করে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে এমন কিছু মাধ্যম তৈরি হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে একজন মানুষের ছড়িয়ে দেওয়া পাপ তার মৃত্যুর পরও চলতে পারে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো—
১. অশ্লীলতা ও পাপের উপকরণ ছড়িয়ে দেওয়া
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। কেউ অশ্লীল ছবি, ভিডিও, গান কিংবা পাপের কাজে উৎসাহিত করে এমন কোনো কনটেন্ট প্রকাশ করলে এবং তার প্রচার ও প্রভাবে অন্যরা পাপে জড়িয়ে পড়লে প্রকাশকারীরও দায় হতে পারে।
বিশেষ করে ইন্টারনেটে প্রকাশিত কনটেন্ট অনেক সময় প্রকাশকারীর মৃত্যুর পরও থেকে যায়। মানুষ সেগুলো দেখে, ডাউনলোড করে কিংবা শেয়ার করে পাপের কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রকাশকারীর উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্টতা ও পাপ ছড়ানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিবেচ্য। তাই কোনো কিছু প্রকাশের আগে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ভাবা উচিত।
২. দ্বীনের নামে ভুল শিক্ষা প্রচার করা
ধর্মীয় বিষয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো বক্তব্য প্রচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ কুরআন-হাদিসের নামে ভিত্তিহীন কথা প্রচার করলে, ভুল আকিদা ছড়িয়ে দিলে কিংবা মানুষকে অন্যায় ও অনৈতিকতার দিকে আহ্বান জানালে এর নেতিবাচক প্রভাব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকতে পারে।
বই, প্রবন্ধ, ভিডিও, বক্তৃতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ভুল শিক্ষা অনুসরণ করে মানুষ বিভ্রান্ত হলে প্রচারকও তার সংশ্লিষ্টতার কারণে গুনাহের অংশীদার হতে পারেন।
বিশেষ করে কুরআন ও হাদিসের নামে কোনো কথা প্রচারের আগে তার বিশুদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। কারণ, একটি ভুল বক্তব্য অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে দীর্ঘদিন বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
৩. অন্যায় প্রথা ও ক্ষতিকর সংস্কৃতি চালু করা
সমাজে এমন অনেক অন্যায় প্রথা রয়েছে, যেগুলো একসময় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলো সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। যেমন— যৌতুকের মতো অন্যায়কে উৎসাহিত করা, অশালীন আয়োজনের প্রচলন করা কিংবা অপচয়ের প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেওয়া।
কেউ যদি এসব অন্যায় প্রথার প্রচলন করে এবং পরবর্তী সময়ে মানুষ তা অনুসরণ করে অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে প্রবর্তকও তার ভূমিকা অনুযায়ী গুনাহের অংশীদার হতে পারেন।
একইভাবে ধর্মের নামে শরিয়তবিরোধী মনগড়া ইবাদত বা রীতি প্রচলন করে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করাও গুরুতর অপরাধ। তবে মনে রাখতে হবে, শরিয়তসম্মত কোনো নতুন ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সুবিধা কিংবা বৈধ সামাজিক রীতিকে ভিত্তিহীনভাবে বিদআত বলা যাবে না। ধর্মীয় বিধান ও সাধারণ বৈধ নতুন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।
৪. পাপের কাজে সহযোগিতার মাধ্যম তৈরি করা
কেউ জেনে-বুঝে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা কিংবা ব্যবস্থা গড়ে তুলল, যার মূল উদ্দেশ্য বা কার্যক্রমের মাধ্যমে সুদ, জুয়া, মাদক কিংবা অন্য কোনো হারাম কাজ পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুর পরও সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যায় চলতে থাকলে তার সংশ্লিষ্টতা ও অবদানের কারণে গুনাহের দায় হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ বৈধ উদ্দেশ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তি তৈরি করার পর অন্যরা সেটি অপব্যবহার করলে সেই অপব্যবহারের সব দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্মাতার ওপর বর্তাবে না। তবে জেনে-বুঝে পাপের কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করলে তার জবাবদিহি করতে হবে।
৫. ভ্রান্ত ফতোয়া ও ভুল ধর্মীয় নির্দেশনা দেওয়া
ধর্মীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও যোগ্যতা ছাড়া ফতোয়া দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। কেউ নিজের অজ্ঞতা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অপর্যাপ্ত জ্ঞানের কারণে ভুল ফতোয়া দিলে এবং মানুষ তার ওপর নির্ভর করে ভুল পথে পরিচালিত হলে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
আর কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে জেনে-বুঝে আল্লাহর বিধান বিকৃত করে হারামকে হালাল কিংবা হালালকে হারাম বলে প্রচার করে, তাহলে সে গুরুতর গুনাহে লিপ্ত হয়। তার বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে অন্যরা ভুল সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলে তাদের বিভ্রান্ত করার দায়ও তার ওপর আসতে পারে।
তাই ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলা, ফতোয়া দেওয়া কিংবা কোনো বিধান প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও যথাযথ জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
৬. সন্তান ও পরিবারকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করা
সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, দ্বীনি মূল্যবোধ শেখানো এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানো বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারা যদি সন্তানকে অন্যায়ে উৎসাহিত করেন, পাপের কাজে সহযোগিতা করেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে তাকে ভুল পথে পরিচালিত করেন, তাহলে এর জন্য জবাবদিহি করতে হতে পারে।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালো কাজের পরিবেশ তৈরি করা এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল অভিভাবকের কর্তব্য। তবে সন্তান নিজের ইচ্ছায় কোনো অন্যায় করলে তার সব দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবা-মায়ের ওপর বর্তায় না। সন্তানকে অন্যায়ের শিক্ষা দেওয়া, পাপে সহযোগিতা করা কিংবা ভুল পথে পরিচালিত করার মতো সংশ্লিষ্টতা থাকলেই সে অনুযায়ী দায় নির্ধারিত হবে।
মুক্তির উপায়: মৃত্যুর আগেই পাপের পথ বন্ধ করা
মৃত্যুর পর মানুষের নিজের পক্ষ থেকে তওবা করা কিংবা নতুন কোনো আমল করার সুযোগ থাকে না। তাই জীবিত থাকতেই নিজের ছড়িয়ে দেওয়া ভুল, অন্যায় ও পাপের প্রভাব দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
১. ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া পাপের উপকরণ সরিয়ে ফেলা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত নিজের অশ্লীল কিংবা পাপের কাজে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হবে। কোনো ভুল বা ক্ষতিকর পোস্ট ছড়িয়ে থাকলে সম্ভব হলে সেটি সংশোধন বা মুছে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রয়োজনে মৃত্যুর পর নিজের ডিজিটাল অ্যাকাউন্টগুলো পরিচালনা বা বন্ধ করার বিষয়ে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যাতে সেগুলো থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত পাপের প্রচার অব্যাহত না থাকে।
২. ভুল শিক্ষা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সংশোধন করা
অতীতে কাউকে ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে কিংবা ভুল পথে পরিচালিত করলে জীবিত থাকতেই তা সংশোধন করতে হবে। যাদের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছেছে, তাদের কাছে যথাসম্ভব সঠিক তথ্য স্পষ্ট করে দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَٰئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ ۚ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
‘তবে যারা তওবা করে, নিজেদের সংশোধন করে এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, আমি তাদের তওবা কবুল করি। আর আমি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৬০)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, শুধু ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং নিজের অবস্থার সংশোধন এবং প্রচারিত ভুলের সত্যতা স্পষ্ট করাও জরুরি।
৩. মানুষের কল্যাণে আসে এমন কাজ রেখে যাওয়া
মৃত্যুর পরও যেন মানুষের উপকার হয়, এমন কাজের ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত। যেমন—দ্বীনি ও উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, উপকারী বই প্রকাশ করা, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে সহযোগিতা করা, বিশুদ্ধ জ্ঞান প্রচার করা এবং সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা।
এ ধরনের কাজ মানুষের উপকারে এলে আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়ার মাধ্যম হতে পারে। তাই শুধু সম্পদ রেখে যাওয়ার চিন্তা না করে মানুষের কল্যাণে আসে এমন কাজ রেখে যাওয়ার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
মানুষের জীবন একদিন শেষ হবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কাজের প্রভাব পৃথিবীতে অনেক সময় থেকে যাবে। সেই প্রভাব মানুষের জন্য কল্যাণের কারণ হবে, নাকি গুনাহের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে— তা নির্ভর করবে তার জীবদ্দশার কাজ, উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্টতার ওপর।
তাই প্রতিটি কথা বলার আগে, কিছু লেখার আগে কিংবা কোনো কাজের প্রচলন করার আগে তার পরিণতি নিয়ে ভাবা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া একটি ভুল তথ্য কিংবা সমাজে চালু করা একটি অন্যায় প্রথাও দীর্ঘদিন ধরে পাপের কারণ হতে পারে। আবার একটি উপকারী শিক্ষা, ভালো উদ্যোগ কিংবা কল্যাণকর কাজ মৃত্যুর পরও সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।
আমাদের প্রত্যেকেরই চেষ্টা করা উচিত, এমন কিছু রেখে যাওয়া, যা মানুষের উপকারে আসবে; এমন কোনো কাজ নয়, যা আমাদের মৃত্যুর পরও গুনাহের বোঝা বাড়াতে থাকবে। কারণ, দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর আর ফিরে এসে ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না। তাই সময় থাকতে তওবা করা, অন্যায়ের পথ বন্ধ করা এবং নেক আমলের বীজ বপন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
মনে রাখতে হবে, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কর্মের প্রভাব থেকে যায়। তাই এমন জীবন গড়তে হবে, যাতে মৃত্যুর পরও আমলনামায় গুনাহ নয়, বরং নেকির পাল্লা ভারী হতে থাকে।

