ঘরে ঢুকেই সালাম দিলে মিলবে যেসব বকরত ও ফজিলত
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা, খোঁজখবর নেওয়া কিংবা বিশ্রাম নেওয়া— এসবই আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভ্যাস। কিন্তু ঘরে প্রবেশের সময় ছোট্ট একটি সুন্নত আমল আমাদের অনেকেরই অবহেলায় থেকে যায়। তা হলো— ঘরে ঢুকে সালাম দেওয়া। অথচ ইসলামে সালাম শুধু সৌজন্যমূলক সম্ভাষণ নয়; এটি শান্তি, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও কল্যাণের দোয়া। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এর মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও বরকত কামনা করা হয়। এমনকি এ আমলকারীর জন্য আল্লাহর বিশেষ হেফাজতের সুসংবাদও রয়েছে।
ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার নির্দেশ কুরআনে
নিজের ঘরে প্রবেশের সময়ও সালাম দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অনেকে মনে করেন, সালাম শুধু অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে দিতে হয়। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً
‘তোমরা যখন ঘরে প্রবেশ করবে, তখন নিজেদের প্রতি সালাম দেবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৬১)
এই আয়াতে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে সালামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সালাম কেবল মুখের কিছু শব্দ নয়; এর মাধ্যমে মানুষের জন্য শান্তি, কল্যাণ ও রহমতের দোয়া করা হয়।
তাই ঘরে প্রবেশের সময় পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলে তাদের সালাম দেওয়া উচিত। আর ঘরে কেউ না থাকলেও সালাম দেওয়ার শিক্ষা ও ফজিলত স্মরণ রাখা উচিত।
পরিবারের জন্য বরকত লাভের আমল
ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার মাধ্যমে শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের সদস্যদের জন্যও বরকত কামনা করা হয়। এ বিষয়ে হজরত আনাস (রা.) থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন—
يَا بُنَيَّ، إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ، يَكُنْ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ
‘হে বৎস! তুমি যখন তোমার পরিবারের কাছে প্রবেশ করবে, তখন তাদের সালাম দেবে। এতে তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে।’ (তিরমিজি ২৬৯৮)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সহজ একটি আমলের মাধ্যমে পারিবারিক জীবনে বরকত লাভের শিক্ষা দিয়েছেন। ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দিলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি মাধ্যম।
আমাদের উচিত, ঘরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষ করে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই এ সুন্নত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে আল্লাহর হেফাজতে থাকার সুসংবাদ
ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার আরেকটি বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এ আমলকারী ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মাদারি বা বিশেষ হেফাজতের অন্তর্ভুক্ত হন। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবু উমামা বাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ثَلَاثَةٌ كُلُّهُمْ ضَامِنٌ عَلَى اللَّهِ إِنْ عَاشَ رُزِقَ وَكُفِيَ، وَإِنْ مَاتَ أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ ... وَرَجُلٌ دَخَلَ بَيْتَهُ بِسَلَامٍ فَهُوَ ضَامِنٌ عَلَى اللَّهِ
‘তিন ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। তারা জীবিত থাকলে আল্লাহ তাদের রিজিক দান করেন এবং তাদের জন্য যথেষ্ট হন। আর তারা মারা গেলে আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন... তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে সালাম দিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করে। সে আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে।’ (আবু দাউদ ২৪৯৪)
এই হাদিসে তিন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
- আল্লাহর পথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হওয়া ব্যক্তি।
- মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হওয়া ব্যক্তি।
- সালাম দিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করা ব্যক্তি।
হাদিসে আল্লাহর জিম্মায় থাকার অর্থ হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব, অনুগ্রহ ও হেফাজতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া। এটি একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়।
ঘরে প্রবেশের সময় কীভাবে সালাম দেবেন?
ঘরে প্রবেশের সময় সুন্দরভাবে সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন—
- ঘরে প্রবেশের সময় বলুন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’
- পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলে তাদের সবাইকে সালাম জানান।
- কেউ সালাম দিলে তার জবাব দেওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا
‘তোমাদের যখন অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন জানাবে অথবা অনুরূপভাবে তার জবাব দেবে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৮৬)
- সালামের উত্তরে ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম’ বলা যায়। আরও উত্তম হলো, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বলা।
- সালাম দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিন। এতে পারিবারিক সম্পর্ক আরও আন্তরিক ও সুন্দর হবে।
সালাম দেওয়ার এ অভ্যাস ঘরের পরিবেশে শান্তি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তাই ঘরে প্রবেশের সময় সালামকে আনুষ্ঠানিকতা মনে না করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ইসলামের সৌন্দর্য হলো, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজের মধ্যেও ইবাদত ও কল্যাণের সুযোগ রাখা হয়েছে। ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া তেমনই একটি সহজ অথচ বরকতময় আমল। এর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়, পরিবারের জন্য কল্যাণ কামনা করা হয় এবং আল্লাহর হেফাজত লাভের আশাও করা যায়।
তাই বাইরে থেকে ঘরে ফিরে সরাসরি কথা বলা কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়ার আগে সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সন্তানদেরও এ সুন্নত শেখান এবং পরিবারের সবাইকে সালামের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করুন।
মনে রাখবেন, একটি ছোট্ট সালাম শুধু সম্ভাষণ নয়; এটি শান্তির বার্তা, ভালোবাসার প্রকাশ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বরকত লাভের একটি সুন্দর মাধ্যম। সুতরাং আজ থেকেই নিজের ঘরে এই সুন্নতের চর্চা শুরু হোক।

