‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কি সঠিক?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে মুসলিম পরিবারগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অনেকেই প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে সন্তানের নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখেন। এ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মুসলমানের আবেগ, ভালোবাসা ও ধর্মীয় অনুভূতি। তবে এ নাম রাখার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সমাজে বেশ কিছু হাদিস প্রচলিত রয়েছে। এমন কিছু হাদিস তুলে ধরা হলো এবং এগুলো সঠিক কিনা তাও তুলে ধরা হলো—
১. রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভের সন্তানের নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখার সিদ্ধান্ত নেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে পুত্র সন্তান দান করবেন। আর যে ঘরে ‘মুহাম্মদ’ নামের কোনো ব্যক্তি থাকবে, আল্লাহ তায়ালা সব সময় সে ঘরে বরকত অব্যাহত রাখবেন। (ফাজায়েলুত্তাসমিয়া বি-আহমদ ওয়া মুহাম্মদ)
২. হাদিসে পাকে ইরশাদ হয়েছে, যদি কারো ঘরে ছেলেসন্তান জন্ম নেবার পর আমার মোহাব্বতে এবং আমার নামের বরকত অর্জনের জন্য তার নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখা হয়, তবে সে এবং তার সন্তান উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করবে। (কানযুল উম্মাল, কিতাবুন নিকাহ, কানযুল আকওয়াল, ৮ম অধ্যায়, হাদিস ৪৫২১৫)
৩. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি (নিজের) কল্যাণ লাভের আশায় ‘মুহাম্মদ’ নাম ধারন করে, কিয়ামত পর্যন্ত তার বরকত নাভ হবে। (কানযুল উম্মাল)
৪. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,একদল লোক যদি পরামর্শ করতে বসে আর তাদের মধ্যকার ‘মুহাম্মদ’ নামক ব্যক্তিকে পরামর্শে শামিল না করে তবে তাদের পরামর্শে কোন কল্যাণ হবে না। (কানযুল উম্মাল)
৫. নবীজি (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন দু’জন ব্যক্তিকে দাঁড় করানো হবে। আদেশ হবে- এদের জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হোক। তারা জানতে চাইবে, ‘ইয়া মাওলা! জান্নাতে যাবার মত তেমন আমল তো আমরা করিনি, তাহলে আমাদের জান্নাতে দেবার কারণ কী?’ অনন্ত-অসীম দয়ালু আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করবেন- ‘জান্নাতে প্রবেশ কর, কেননা আমি শপথ করেছি যে, যার নাম ‘আহমদ’ কিংবা ‘মুহাম্মদ’ হবে, সে জাহান্নামে যাবে না’ সুবহানাল্লাহ্! (ফিরদাউসুল আখবার ৮৫১৫)
৬. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের নাম ‘মুহাম্মদ’ রেখে তাকে গালি দিও না। (হাকেম ৭৭৯৫)
৭. অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, প্রত্যেক জান্নাতীকে তার নামেই ডাকা হবে। তবে হজরত আদম (আ.)-কে ‘আবু মুহাম্মদ’ বলে ডাকা হবে। (সিফাতুল জান্নাহ, আবু নুআঈম)
৮. হজরত ইবনে ওয়াহাব বলেন, আমি নিজের সাতটি সন্তানের নাম গর্ভাবস্থায়ই ‘মুহাম্মদ’ রাখার নিয়ত করেছি, এর বরকতে সব সন্তানই ছেলে হয়েছে। (কাশফুল গুম্মাহ ১/২৮৩)
৯. ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, যে ঘরেই ‘মুহাম্মদ’ নামের কোনো ব্যক্তি থাকবে তাতে বরকত ছড়াতে থাকবে। (ফয়জুল ক্বদীর ৫/৪৫৩)
১০. অনুরূপভাবে অন্য হাদিস শরিফে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি বরকত লাভের আশায় আমার নামে নাম রাখবে, কিয়ামত পর্যন্ত তার উপর রহমত বর্ষিত হবে।’ (কানযুল উম্মালের ৪৫২১৩)
১১. হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা (রহ.) বর্ণনা করেন, আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর (রা.) আবু আবদুল হামিদের দিকে তাকালেন, যার নাম ‘মুহাম্মদ’ ছিল। এমতাবস্থায় অন্য এক ব্যক্তি ‘মুহাম্মদ’কে গালাগাল করছিল। তখন আমিরুল মুমিনিন বললেন, হে ইবনে যায়েদ, এদিকে আসো! এবং বললেন, আমি দেখছি যে, তোমার নাম ‘মুহাম্মদ’ হওয়ায় আমাদের সরদার হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তাআলার কসম! যতদিন আমি জীবিত আছি, আজ থেকে যেন তোমাকে আর ‘মুহাম্মদ’ নামে না ডাকা হয়। অতঃপর তার নাম আব্দুর রহমান রাখলেন। এরপর তালহার সন্তানদের ডেকে পাঠালেন, তাদের সংখ্যা তখন সাতজন ছিল। যাদের বড়জনের নাম ‘মুহাম্মদ’ ছিল- এ উদ্দেশ্যে যে তারা যেন তাদের মুহাম্মদ নাম পরিবর্তন করে নেয়। মুহাম্মদ ইবনে তালহা তখন বললেন, আল্লাহর শপথ! আপনি এ কী করছেন? স্বয়ং নবী করিম (সা.) আমার নাম ‘মুহাম্মদ’ রেখেছেন। এতে হজরত ওমর (রা.) বললেন, যখন রাসুল (সা.) নিজেই এ নাম রেখেছেন, তাহলে তো আমার কোনো পথ নেই। (মুসনাদে আহমাদ ৪/২১৬)
উল্লেখিত এসব বর্ণনার কোনটি সহিহ, কোনটি দুর্বল আর কোনটি জাল বা বানোয়াট? হাদিসবিশারদদের গবেষণায় এসব বর্ণনার কী পরিণতি উঠে এসেছে? বিষয়টি জানা জরুরি। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা যেমন ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি, তেমনি তার নামে কোনো কথা প্রচারের আগে সেটির বিশুদ্ধতা যাচাই করাও প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সম্পর্কে উল্লেখিত প্রচলিত বর্ণনাগুলোর অধিকাংশই বানোয়াট। নিচে প্রতিটি বর্ণনার হুকুম আলাদা আলাদাভাবে তুলে ধরা হলো—
১. ما من مسلم دنا من زوجته وهو ينوى إن حبلت منه أن يسمى محمدا إلا رزقه الله ولدا ذكرا
যে মুসলমান স্বীয় বিবির সাথে সহবাসের সময় এ নিয়ত করে যে, যদি এ সহবাসের দ্বারা সন্তান হয়, তাহলে তার নাম মুহাম্মদ রাখবে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ছেলে সন্তান দান করবেন। উক্ত বর্ণনাকে মোল্লা আলী রহ. এবং আল্লামা মুহাম্মদ বিন খলীল কাউকজী তারাবুলুসী রহ. জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন। (আল মওযূআতুল কুবরা ৩১০, ১১৯৩, আল-লু’লুউল মারছূছ-১৬৪, ৪৮৮)
হাফেজ ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, এটি জাল হাদীস। (তানযীহুশ শরীয়াতিল মারফূআহ ১/১৭৪)
আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. বলেন, এ হাদীস প্রমাণিত নয়। (আল-লাআলিউল মাসনূআহ ১/১০৬)
ما من أهل بيت فيهم اسم نبي إلا بعث الله تبارك وتعالى إليهم ملكا يقدسهم بالغداة والعشي
‘যে পরিবারে কোনো নবীর নাম থাকবে, সেখানে ফেরেশতারা সকাল-সন্ধ্যা পবিত্রতা কামনা করে। এ শব্দের হাদীসটিও জাল ও বানোয়াট। [আল ফাওয়ায়েদুল মাজমূআ ৪৬৯)
২. وعن أبي أمامة، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم، أنه قال: من ولد له مولود فسماه محمدا حبا فيّ وتبركا باسمي كان هو ومولوده في الجنة
কারো ছেলে সন্তান জন্ম নিলে আমার মোহাব্বত ও বরকত লাভের আশায় তার নাম ‘মুহাম্মদ’ রাখলে উক্ত ব্যক্তি এবং তার সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এটিও জাল হাদিস।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন এটি জাল। (আল-মানারুল মুনীফ ৫২)
আল্লামা কাউকজী রহ. বলেন, এটি বানোয়াট। (আল-লু’লুউল মারছূছ ২০২)
ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, এটি মওযূ। (মীযানুল ই’তিদাল ১/৪৪৭)
ইবনুল যাওজী রহ. বলেন, এটি জাল। (আল-মওযূআত ১/১৫৭)
৩ ও ১০- من تسمى بأسمي يرجو بركتي غدت عليه البركة وراحت إلى يوم القيامة
যে আমার নামে নাম রাখবে বরকতের আশায়, সে বরকত ও রহমাতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।
এ বর্ণনার রাবী জুশাইব— মাজহুল। (উসদুল গাবাহ ৩/৩৩৭)
আবু আসেম বলেন, জুশাইব কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন কি না? জানা নেই। (জমউল জাওয়ামে ৮/৮১১)
৪. ما اجتمع قوم في مشورة معهم رجل اسمه محمد لم يدخلوه في مشورتهم إلا لم يبارك لهم فيه
কোনো সম্প্রদায় বা দল যখন কোনো পরামর্শ সভায় (মিটিং বা বৈঠক) মিলিত হয় এবং তাদের সাথে ‘মুহাম্মদ’ নামের কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকে, অথচ তারা তাকে তাদের পরামর্শে শরিক বা অন্তর্ভুক্ত করে না, তখন আল্লাহ তাদের সেই পরামর্শের কাজে বরকত দেন না (বা তাদের সেই কাজে বরকত ক্ষুণ্ণ হয়)।
ইবনুল যাওযী রহ. এটিকে মওযূ বর্ণনার অন্তর্ভূক্ত করেছেন। (কানযুল উম্মাল ফী সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফআল ৪৫২২৪, আল ফাওয়ায়েদুল মাজমূআ ১/৪৭১ বর্ণনা নং ২৯)
৫. عن أنس قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يوقف عبدان بين يدي الله تعالى فيأمر بهما إلى الجنة فيقولان: ربنا بما استوجبنا الجنة ولم نعمل عملا يجازينا الجنة؟ فيقول ربنا سبحانه: عبديّ ادخلا الجنة فإني آليت على نفسي أن لا أدخل النار من أسمه أحمد ولا محمد
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— আল্লাহর দরবারে দু’জন বান্দাকে এনে দাঁড় করানো হবে। অতঃপর তাদের উভয়কে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। তখন তারা দু’জন বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা কিসের বিনিময়ে জান্নাত পাওয়ার যোগ্য হলাম? আমরা তো এমন কোনো (নেক) আমল করিনি যার প্রতিদান হিসেবে আমাদের জান্নাত দেওয়া হতে পারে।’ তখন আমাদের প্রতিপালক সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলবেন, ‘হে আমার দুই বান্দা! তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর; কেননা আমি নিজের ওপর এই অবধারিত ফয়সালা (বা কসম) করে রেখেছি যে, যার নাম আহমাদ অথবা মুহাম্মদ, তাকে আমি জাহান্নামে প্রবেশ করাব না।’
ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, এটি মওযূ তথা বানোয়াট। (তারতীবুল মওযূআত ৩৩)
ইবনুল যাওজী রহ. বলেন, এটি বানোয়াট। (আল মাওযূআত ৩২৬)
৬. عَن أَنَسٍ أَن النَّبِي قَالَ: تُسَمُّونَهُمْ مُحَمَّدًا ثُمَّ تَسُبُّونَهُمْ
তোমরা মুহাম্মদ নাম রেখে তারপর তাকে গালি দাও? (এমনটি করবে না)
এ বর্ণনাটি দুর্বল। (আয যুআফাউল কাবীর লিল উকাইলী ১/২৫৮)
৭. أهلُ الجنةِ يُدعَون بأسمائِهم إلا آدمَ فإنه يُكنَّى أبا محمدٍ
জান্নাতীদের তাদের নাম ধরে ডাকা হবে, তবে আদম আলাইহিস সালামকে ‘আবু মুহাম্মদ’ বলে ডাকা হবে।
ইবনে হিব্বান রহ. বলেন, এটি বাতিল ও মাওযূ। (আল মাজরূহীন ১/৪৬১)
ইবনে আদী রহ. বলেন, এটি বাতিল বর্ণনা। (আল কামেল ফিয যুআফা ৫/৭৪)
ইবনে কায়সারানী রহ. বলেন, এটি বাতিল বর্ণনা। (যখীরাতুল হুফফাজ ৫/২৭৮৪)
ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, এটি মুনকার বর্ণনা। (মীযানুল ই’তিদাল ৪/৩৫৫)
ইবনুল যাওযী রহ. বলেন, এটি মওযূ। (আল মওযূআত ৩/৫৮৭)
৮ ও ৯- ইবনে ওয়াহহাব রহ. এবং ইমাম মালেক রহ. এর বক্তব্য হাদীস নয়।
সুতরাং ‘মুহাম্মদ’ নাম রাখলে ছেলে সন্তান হবে বিশ্বাস করা, কিংবা এটাকে নবীজীর বাণী মনে করার কোন সুযোগ নেই।
১১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামের সম্মান রক্ষায় হজরত ওমর রা. এর নাম পরিবর্তন করার বিষয়টি সঠিক। এই আছারটি সহীহ সনদে বর্ণিত—
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى، قَالَ: نَظَرَ عُمَرُ إِلَى أَبِي عَبْدِ الْحَمِيدِ – أَوْ ابْنِ عَبْدِ الْحَمِيدِ، شَكَّ أَبُو عَوَانَةَ -، وَكَانَ اسْمُهُ مُحَمَّدًا وَرَجُلٌ يَقُولُ لَهُ: يَا مُحَمَّدُ، فَعَلَ اللَّهُ بِكَ، وَفَعَلَ، وَفَعَلَ، قَالَ: وَجَعَلَ يَسُبُّهُ، قَالَ: فَقَالَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ عِنْدَ ذَلِكَ: يَا ابْنَ زَيْدٍ، ادْنُ مِنِّي، قَالَ: أَلَا أَرَى مُحَمَّدًا يُسَبُّ بِكَ لَا وَاللَّهِ لَا تُدْعَى مُحَمَّدًا مَا دُمْتُ حَيًّا، فَسَمَّاهُ عَبْدَ الرَّحْمَنِ، ثُمَّ أَرْسَلَ إِلَى بَنِي طَلْحَةَ لِيُغَيِّرَ أَهْلُهُمْ أَسْمَاءَهُمْ، وَهُمْ يَوْمَئِذٍ سَبْعَةٌ وَسَيِّدُهُمْ وَأَكْبَرُهُمْ مُحَمَّدٌ، قَالَ: فَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ طَلْحَةَ: أَنْشُدُكَ اللَّهَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ فَوَاللَّهِ إِنْ سَمَّانِي مُحَمَّدًا – يَعْنِي – إِلَّا مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ عُمَرُ: «قُومُوا، لَا سَبِيلَ لِي إِلَى شَيْءٍ سَمَّاهُ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (مسند احمد، رقم-17896، المعجم الكبير للطبرانى، رقم-544، مجمع الزوائد، رقم-12833)
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লায়লা (রহ.) বর্ণনা করেন, আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর (রা.) আবু আবদুল হামিদের দিকে তাকালেন, যার নাম ‘মুহাম্মদ’ ছিল। এমতাবস্থায় অন্য এক ব্যক্তি ‘মুহাম্মদ’কে গালাগাল করছিল। তখন আমিরুল মুমিনিন বললেন, হে ইবনে যায়েদ, এদিকে আসো! এবং বললেন, আমি দেখছি যে, তোমার নাম ‘মুহাম্মদ’ হওয়ায় আমাদের সরদার হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তাআলার কসম! যতদিন আমি জীবিত আছি, আজ থেকে যেন তোমাকে আর ‘মুহাম্মদ’ নামে না ডাকা হয়। অতঃপর তার নাম আব্দুর রহমান রাখলেন। এরপর তালহার সন্তানদের ডেকে পাঠালেন, তাদের সংখ্যা তখন সাতজন ছিল। যাদের বড়জনের নাম ‘মুহাম্মদ’ ছিল- এ উদ্দেশ্যে যে তারা যেন তাদের মুহাম্মদ নাম পরিবর্তন করে নেয়। মুহাম্মদ ইবনে তালহা তখন বললেন, আল্লাহর শপথ! আপনি এ কী করছেন? স্বয়ং নবী করিম (সা.) আমার নাম ‘মুহাম্মদ’ রেখেছেন। এতে হজরত ওমর (রা.) বললেন, যখন রাসুল (সা.) নিজেই এ নাম রেখেছেন, তাহলে তো আমার কোনো পথ নেই। (মুসনাদে আহমাদ ৪/২১৬, ১৭৮৯৬; মুজামুল কাবির, তাবারানি ৫৪৪; মুজমাউর যাওয়ায়িদ ১২৮৩৩)
পরিশেষে
‘মুহাম্মদ’ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সম্মানিত ও সুন্দর একটি নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে সন্তানের এ নাম রাখা প্রশংসনীয়। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের নামে নাম রাখার অনুমতিও দিয়েছেন। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন—
سَمُّوا بِاسْمِي وَلَا تَكْتَنُوا بِكُنْيَتِي
‘তোমরা আমার নামে নাম রাখো, তবে আমার কুনিয়াত (বিশেষ উপনাম) গ্রহণ কর না।’ (মুসলিম ২১৩৩)
তবে এ নাম রাখলেই সন্তান বা মা-বাবার জান্নাত নিশ্চিত হবে, ঘরে বিশেষ বরকত নেমে আসবে কিংবা কিয়ামত পর্যন্ত বিশেষ রহমত লাভ হবে—এমন প্রচলিত বর্ণনাগুলোর অধিকাংশই জাল বা অপ্রমাণিত বলে হাদিসবিশারদরা উল্লেখ করেছেন।
তাই কোনো বর্ণনার প্রতি আবেগের বশবর্তী হয়ে সেটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, শুধু নামের মধ্যে নয়, বরং সেই নামের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা এবং নবীজির (সা.) আদর্শ অনুসরণ করার মধ্যেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত। সন্তানের নাম মুহাম্মদ রাখার পাশাপাশি তার মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, সুন্নাহর অনুসরণ, উত্তম চরিত্র ও ইসলামী মূল্যবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করাই হবে সবচেয়ে সুন্দর উদ্যোগ।

