সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও জীবনের নানা বাকল এখনও যেন বঞ্চনার কাঁটায় জড়িয়ে থাকে অনেক নারীর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেদনাদায়ক হলো নিজের পরিবার বা স্বজনদের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। যুগের পর যুগ ধরে সমাজ ব্যবস্থার পালাবদল ঘটলেও আজও অনেক নারী জানেন না আইনে ঠিক কতখানি অধিকার তাঁদের নিজের প্রাপ্য। বিশেষ করে অজপাড়াগাঁ বা মফস্বলের কথা বাদই দিলাম, সচেতনতার আলো এখনও সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।
ইসলামী শরিয়ত বা মুসলিম আইন অনুযায়ী, বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে একজন ছেলে সন্তান যা পায়, কন্যাসন্তান সাধারণত তার অর্ধেক অংশ পায়। তবে এখানেই শেষ নয়— বাবা ছাড়াও জীবনের নানা সম্পর্কের মোড়ে দাঁড়িয়ে নারীরা আরও বিভিন্ন উৎস থেকে সম্পত্তির অংশীদার হয়ে থাকেন। চলুন, একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক পরিবার ও সমাজে একজন নারী মুসলিম আইন অনুযায়ী ঠিক কী কী অধিকার লাভ করেন।
জীবনের সুরক্ষায় দেনমোহরের অধিকার
বিয়ে কেবল দুটি মনের মিলন নয়, এটি এক পবিত্র সামাজিক বন্ধন। এই বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় মুসলিম আইনে একজন নারীর জন্য নির্ধারিত থাকে ‘দেনমোহর’। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর প্রতি এক ধরনের আর্থিক সম্মান ও নিরাপত্তা।
বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগেই কিংবা বিয়ের পরপরই স্বামী এই নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ স্ত্রীকে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য। কোনো কারণে স্বামী তা পরিশোধ না করলে স্ত্রী যেকোনো সময় আইনগতভাবে তা আদায়ের অধিকার রাখেন। আর যদি স্বামী জীবদ্দশায় এই দেনমোহর পরিশোধ করে যেতে না পারেন, তবে মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকেই সবার আগে এই পাওনা মিটিয়ে দিতে হয়।
স্বস্তির চাদর: ভরণপোষণ নেওয়ার অধিকার
ইসলাম ধর্মে অদ্ভুত সুন্দর এক দায়িত্বের ভারসাম্য রয়েছে। সমাজের সব আর্থিক ঝক্কি-ঝামেলা আর খরচের পাহাড় পুরুষের কাঁধেই সঁপে দেওয়া হয়েছে।
- ঘরের পুত্রসন্তান যখন বড় হয়ে উপার্জনে সক্ষম হয়, তখন পুরো সংসারের দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়।
- স্বামী হিসেবে তাকে স্ত্রীর যাবতীয় ভরণপোষণ জোগাতে হয়।
- বাবা হিসেবে নিজের ছেলেমেয়েদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং মেয়ের ধুমধামে বিয়ের ব্যবস্থা করা তার অবশ্যকর্তব্য।
- আবার ভাই হিসেবে ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা এবং অবিবাহিত বোনদের ভালোমতো বিদায় দেওয়ার দায়িত্বও ভাইয়েরই।
আমাদের দেশে মা-বাবার ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা আইনও রয়েছে। অর্থাৎ, ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী নারীদের এসব আর্থিক ও বাহ্যিক লড়াইয়ের দায় থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা হয়েছে। ঘরের মেয়ে বা স্ত্রী হিসেবে এসব খরচ বহন করা নারীর জন্য সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক—চাইলে তারা করতে পারেন, আর না করলে কেউ তাদের জোর করতে পারে না।
উত্তরাধিকারের ডালপালায় নারীর অংশ
পুরুষেরা সাধারণত উত্তরাধিকার সূত্রে কেবল বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকেই একটি নির্দিষ্ট অংশ পেয়ে থাকেন। কিন্তু একটু হিসাব করে দেখলেই বোঝা যায়, নারীর পরিধিটা এখানে আরও অনেক বিস্তৃত!
একজন নারী শুধু সন্তান হিসেবে মা-বাবার সম্পত্তি থেকেই ভাগ পান না; স্বামী মারা গেলে স্ত্রী হিসেবে স্বামীর সম্পত্তিতেও তাঁর অধিকার জন্মায়। আবার মা হিসেবে নিজের সন্তানের কাছ থেকেও তিনি সম্পত্তির অংশ পান। একটু গভীরভাবে ভেবে সব দিক যোগ করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন সম্পর্ক মিলিয়ে একজন নারী দিনশেষে যে পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হন, তা কেবল বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া একজন পুরুষের সম্পত্তির পরিমাণের চেয়ে কোনো অংশে কম তো নয়ই, বরং অনেক সময় তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে।
কিন্তু বেদনার বিষয় হলো, আইন এত স্পষ্ট হওয়ার পরেও বাস্তবের চিত্রটা বড় করুণ। এ প্রসঙ্গে এক সিনিয়র আইনজীবী গণমাধ্যমকে জানান—
‘মুসলিম আইনে নারীদের সম্পত্তির যে অধিকার রয়েছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কোনো নারী উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে বঞ্চিত হবে না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মুসলিম নারী আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অধিকার পায় না। এতে স্বামী মারা গেলে বা বিবাহবিচ্ছেদ হলে তাদের অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়। এখনো গ্রামের অনেক নারী, এমনকি শহরেও বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয় নারীরা।’
আইন বইয়ের পাতায় সুন্দর হরফে লেখা থাকলেই তো চলবে না, তার সুফল ঘরের কোণে পৌঁছে দেওয়াটাই আসল কথা। আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা কুসংস্কার আর অনীহা দূর করতে হবে সবার আগে। ঘরের মেয়ে কিংবা বোনকে পর ভাবার সেই প্রাচীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। সচেতনতার আলো জ্বালিয়ে প্রতিটি পরিবারে যদি মুসলিম আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবেই কেবল বঞ্চনার কুয়াশা কাটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন আমাদের নারীরা। আর তখনই সমাজ পাবে এক সত্যিকারের ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক রূপ।

