Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

গর্ভে সন্তান রেখে মায়ের মৃত্যু হলে যেভাবে দাফন করতে হবে

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

গর্ভে সন্তান রেখে মায়ের মৃত্যু হলে যেভাবে দাফন করতে হবে

মানবজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও জটিল পরিস্থিতির একটি হলো—গর্ভবতী অবস্থায় কোনো নারীর মৃত্যু। এ অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই দাফন সম্পন্ন করা হবে, নাকি আগে গর্ভস্থ সন্তানের জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি? 

ইসলামী শরীয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম, মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছে, যা ফিকহি গ্রন্থসমূহে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। 

ইসলামের সাধারণ বিধান হলো মৃত ব্যক্তিকে বিলম্ব না করে দাফন করা উত্তম। কিন্তু যখন বিষয়টি গর্ভবতী নারীর, তখন এই সাধারণ বিধানের সঙ্গে একটি ব্যতিক্রম যুক্ত হয়। 

কারণ এখানে আরেকটি সম্ভাব্য জীবন জড়িত গর্ভস্থ সন্তান। তাই আলেমগণ একমত যে, এমন ক্ষেত্রে দাফনের আগে সন্তানের অবস্থা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। 

হানাফি মাজহাবের ইমামরা বলেন, যদি শক্তভাবে ধারণা করা যায় যে গর্ভস্থ সন্তান জীবিত, তাহলে দাফন বিলম্বিত করে সন্তানকে উদ্ধারের চেষ্টা করা বৈধ। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘গালিবুয্‌যান’ বা শক্ত ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে মৃতদেহে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। যদি সন্তানের জীবিত থাকার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে মাকে স্বাভাবিক নিয়মে, পূর্ণ সম্মানের সঙ্গে দাফন করা হবে।

শাফেয়ী মাজহাবের আলেমরাও এ বিষয়ে অনুরূপ মত পোষণ করেন। তারা বলেন, যদি চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সন্তান জীবিত, তাহলে তাকে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। 

অন্যথায় মৃতদেহে কোনো প্রকার কাটাছেঁড়া করা বৈধ নয়। কারণ মৃতের সম্মান রক্ষা করা শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি। 

মালেকী মাজহাবে কিছুটা সতর্কতা বেশি দেখা যায়। তাদের মতে, কেবল তখনই মায়ের দেহে হস্তক্ষেপ করা যাবে, যখন সন্তানের জীবিত থাকার ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত হওয়া যায়। সন্দেহ থাকলে দাফন বিলম্বিত না করে সম্পন্ন করা উত্তম। কারণ মৃতদেহের অখণ্ডতা রক্ষা তাদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

হাম্বলী মাজহাবের আলেমরাও বলেন, সন্তানের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা থাকলে মায়ের পেট চিরে তাকে বের করার অনুমতি রয়েছে। তবে তা অবশ্যই দক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে এবং সম্মান বজায় রেখে করতে হবে। 

প্রাচীন যুগে গর্ভস্থ সন্তানের জীবিত থাকার আলামত নির্ণয়ের জন্য কিছু বাস্তব লক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, মায়ের পেটে নড়াচড়া অনুভূত হওয়া, পেটের অস্বাভাবিক সঞ্চালন, কিংবা মৃত্যুর কিছু সময় পরও পেটের উষ্ণতা বজায় থাকা। এসব আলামতের ভিত্তিতে অভিজ্ঞ ধাত্রী বা চিকিৎসক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। 

আধুনিক যুগে এই প্রক্রিয়া আরও উন্নত হয়েছে। আল্ট্রাসাউন্ড, হার্টবিট মনিটরিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব দ্রুত সন্তানের অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব। 

ইসলামী ইতিহাসে এ বিষয়ে একটি আলোচিত বর্ণনা পাওয়া যায়, যা ইমাম আবু জর রহ. এর মায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত আছে, তার মা গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে বিশেষ পরিস্থিতিতে তার জন্ম হয়। 

যদিও এ বর্ণনার সনদ ও বিশুদ্ধতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবুও এটি মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ঘটনা হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের বর্ণনা মূলত এ বিষয়টির গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলাম কখনোই অযথা দেরি করতে উৎসাহ দেয় না, আবার সম্ভাব্য জীবনকে অবহেলাও করে না। তাই গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হলে, দাফনের আগে দ্রুত কিন্তু সতর্কভাবে সন্তানের অবস্থা যাচাই করা হবে। 

যদি জীবিত থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হবে, আর যদি না থাকে, তাহলে দাফন বিলম্ব না করে সম্পন্ন করা হবে। 

এই পুরো বিধানটি ইসলামের একটি মৌলিক দর্শনকে সামনে আনে জীবনের প্রতি সম্মান এবং মৃত্যুর পর মর্যাদা উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে একটি সম্ভাব্য জীবনের সুরক্ষা, অন্যদিকে মৃত মায়ের সম্মান রক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে যে ভারসাম্য ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে, তা সত্যিই অনন্য। 

পরিশেষ বলা যায়, গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং এটি একটি জটিল ফিকহি বাস্তবতা। ইসলামী শরীয়ত এ বাস্তবতাকে গভীর প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে মোকাবিলা করার নির্দেশনা দিয়েছে যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুসরণযোগ্য। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .