Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

খাবারে হালাল, উপার্জনে হারাম

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

খাবারে হালাল, উপার্জনে হারাম

ইসলামে ইবাদত শুধু বাহ্যিক কিছু অনুশীলনের নাম নয়, এটি এক অন্তর্লৌকিক পবিত্রতার সাধনা, যেখানে দেহ, মন ও উপার্জন সবকিছু মিলেই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। 

অথচ আমাদের বাস্তবতা যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে আবদ্ধ খাবারের বেলায় আমরা হালাল-হারামের সূক্ষ্ম হিসাব করি, কিন্তু উপার্জনের ক্ষেত্রে সেই সংবেদনশীলতা প্রায়শই বিলীন হয়ে যায়। আমরা পবিত্র আহার চাই, অথচ সেই আহারের উৎস কতটা পবিত্র সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাই। 

পবিত্র কুরআন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে, হে মানুষ! তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর। (সুরা আল-বাকারা১৬৮)

এই নির্দেশ কেবল খাদ্যের জন্য নয়, বরং উপার্জনের উৎসকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ হারাম উপার্জন দিয়ে কেনা খাদ্য কখনো প্রকৃত অর্থে ‘তয়্যিব’ পবিত্র হতে পারে না। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে এক গভীর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত, অগোছালো অবস্থায় দু’হাত তুলে দোয়া করছে ‘হে আমার রব!’ কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পুষ্ট, ফলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? 

এই হাদিস আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচন করে ইবাদতের বাহ্যিক দৃশ্য যতই সুন্দর হোক, যদি তার ভিত্তি হারাম উপার্জনে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার পথে বাধাগ্রস্ত হয়। 

ফিকহ ও তাসাউফের মহান ইমামরা এ বিষয়ে সর্বদা সতর্ক করে গেছেন। ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) তার প্রসিদ্ধ রচনায় উল্লেখ করেন হারাম উপার্জন মানুষের অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে, আর সেই অন্ধকারে ইবাদতের নূর প্রবেশ করতে পারে না। 

তার দৃষ্টিতে, হালাল রুজি কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধির মৌলিক শর্ত। 

অন্যদিকে ইমাম ইবনু রজব আল-হানবলী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জনে যত্নবান, তার আমল বরকতময় হয়, আর যে হারামে লিপ্ত, তার নেক আমলও ধীরে ধীরে প্রভাবহীন হয়ে পড়ে। 

এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় হালাল রুজি ইবাদতের প্রাণ, আর হারাম রুজি তার অন্তঃসারশূন্যতা। 

আমাদের সমাজে আজ যে সংকটটি সবচেয়ে ভয়াবহ, তা হলো আমরা সুদের লেনদেন, ঘুষ, প্রতারণা ও অসৎ উপার্জনকে ‘ব্যবসার নিয়ম’ বা ‘সময়ের চাহিদা’ বলে স্বাভাবিক করে তুলেছি। 

অথচ একই মানুষ খাবারের প্লেটে একটুকরো সন্দেহজনক জিনিসও গ্রহণ করতে দ্বিধা করে। এই দ্বৈত মানসিকতা কেবল নৈতিক অবক্ষয়েরই পরিচায়ক নয়, বরং এটি ইবাদতের গভীরতা ও আন্তরিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। 

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ইবাদত শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত ইবাদত। উপার্জনের ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও হালাল-হারামের সীমারেখা রক্ষা করা এগুলোই সেই ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

আজ প্রয়োজন এক গভীর আত্মসমালোচনার আমরা কি সত্যিই সেই হালাল রুজির পথে আছি, যা আমাদের ইবাদতকে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে? নাকি আমরা বাহ্যিক পবিত্রতার আড়ালে এক অদৃশ্য অশুদ্ধতাকে লালন করছি? 

হালাল রুজি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ঈমানের অপরিহার্য দাবি। যে হাত হালাল উপার্জনে রঞ্জিত, সেই হাতই দোয়ার জন্য আকাশে উঠলে তা রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে। আর যে জীবনে হারামের ছায়া প্রবেশ করে, সেখানে ইবাদতের আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে। 

অতএব, ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা চাইলে প্রথমেই শুদ্ধ করতে হবে আমাদের উপার্জনের পথ। কারণ হালাল রুজিই সেই নীরব শর্ত, যার উপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের সব ইবাদতের প্রকৃত মূল্য। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .