কম দামে ডেটা কিনে বেশি দামে বিক্রি করা কি জায়েজ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রশ্ন
এক ব্যক্তি জানতে চান, কোনো পণ্যের মালিক না হলে তা বিক্রি করা জায়েজ নয়। কিন্তু ইন্টারনেট ডাটা (এমবি/জিবি) তো সরাসরি নিজের মালিকানায় নেওয়া যায় না। আবার কমিশনভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে কমিশনও নির্ধারিত হতে হয়।
এখন আমি ক্রয়-বিক্রয় না করে গ্রাহকের সঙ্গে এভাবে চুক্তি করি যে, ৫ জিবি ডাটা সরবরাহ করতে কেউ ৫ টাকা নেয়, আবার কেউ ৮ টাকা নেয়। আমি গ্রাহককে ৮ টাকায় ডাটা দেওয়ার চুক্তি করে পরে যার কাছ থেকে কম দামে পাওয়া যায়, তার মাধ্যমে গ্রাহকের নম্বরে ডাটা পাঠিয়ে দিই। এভাবে একটি চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রাহকের কাছ থেকে নির্ধারিত টাকা গ্রহণ করি। এ পদ্ধতিতে লেনদেন করা কি জায়েজ হবে? আর এ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত অর্থকে কি সার্ভিস চার্জ বলা যাবে?
উত্তর
ঢাকার বিমানবন্দর এলাকার জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস মুফতি জাওয়াদ তাহের বলেন, আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে লেনদেন করা এবং এভাবে উপার্জিত অর্থ গ্রহণ করা জায়েজ। এ অর্থকে ব্যবসায়িক মুনাফা কিংবা সেবা প্রদানের সার্ভিস চার্জ—উভয়ভাবেই অভিহিত করা যেতে পারে।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, «لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ»
অর্থ: ‘যা তোমার কাছে নেই, তা বিক্রি করো না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১২৩২)
ফিকহের আলোচনায় এ নিষেধাজ্ঞা মূলত এমন পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা বিক্রেতার মালিকানায় বা শরিয়তসম্মত কর্তৃত্বে নেই এবং যার বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি।
অন্যদিকে, ইন্টারনেট ডাটা (এমবি/জিবি) ও টকটাইম (মিনিট) সাধারণ দৃশ্যমান পণ্যের মতো নয়; এগুলো মূলত ডিজিটাল সেবা বা উপযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামী ফিকহে সেবা ও উপযোগ সরবরাহের চুক্তি—যেমন ইজারা—শরিয়তসম্মত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে করা যায়।
অর্থাৎ, আপনার লেনদেনটি যদি এমন হয় যে, আপনি গ্রাহকের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা সরবরাহ করার দায়িত্ব নিচ্ছেন, তাহলে এটিকে সেবা সরবরাহের চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমন, আপনি গ্রাহককে জানালেন যে, তার নির্দিষ্ট সিমে ৫ জিবি ডাটা সক্রিয় করে দিতে ৮ টাকা লাগবে। গ্রাহক তাতে সম্মত হলেন। এরপর আপনি অন্য কোনো সরবরাহকারীর কাছ থেকে কম দামে ডাটা সংগ্রহ করে গ্রাহকের নম্বরে তা সক্রিয় করে দিলেন।
এ ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেবা সরবরাহের দায়িত্ব আপনার ওপর থাকবে। আপনি যদি ৫ টাকায় ডাটা সংগ্রহ করে গ্রাহকের কাছ থেকে ৮ টাকা গ্রহণ করেন, তাহলে অবশিষ্ট ৩ টাকা আপনার ব্যবসায়িক মুনাফা হতে পারে। তবে এ বিধান প্রযোজ্য হবে তখনই, যখন লেনদেনটি প্রকৃতপক্ষে সেবা সরবরাহের চুক্তি হবে এবং এতে শরিয়তবিরোধী কোনো শর্ত বা প্রতারণা থাকবে না।
আপনি উল্লেখ করেছেন, কমিশনও নির্ধারিত হতে হয়। এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা দরকার, আপনি যদি গ্রাহকের প্রতিনিধি হিসেবে তার পক্ষ থেকে ডাটা কিনে দেন, তাহলে আপনার পারিশ্রমিক বা কমিশন কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট থাকা জরুরি। কিন্তু আপনি যদি নিজ দায়িত্বে নির্দিষ্ট মূল্যে ডাটা সরবরাহের চুক্তি করেন, তাহলে তা নিছক প্রতিনিধিত্ব বা দালালির চুক্তি নয়; বরং চুক্তির প্রকৃতি অনুযায়ী সেবা সরবরাহের চুক্তি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যে চুক্তি করে কম খরচে সেবা সরবরাহ করা এবং বৈধ মুনাফা গ্রহণ করা জায়েজ।
এ ব্যবসা বৈধ হওয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
১. সেবা সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ: গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি করার পর নির্ধারিত পরিমাণ ডাটা তার নম্বরে সক্রিয় করে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার থাকবে। কোনো কারণে ডাটা সরবরাহ করা সম্ভব না হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হবে।
২. পরিমাণ, মেয়াদ ও শর্ত স্পষ্ট করা: ডাটার পরিমাণ, মেয়াদ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য শর্ত গ্রাহককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোনো ধরনের প্রতারণা, গোপনীয় শর্ত বা বিভ্রান্তি থাকা যাবে না
৩. বৈধ মাধ্যম ব্যবহার করা: যে অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম বা সরবরাহকারীর মাধ্যমে ডাটা সংগ্রহ করছেন, তা বৈধ হতে হবে। হ্যাকিং, জালিয়াতি, অননুমোদিত পদ্ধতি কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়মবিরোধী কোনো উপায়ে ডাটা সরবরাহ করা যাবে না।
ফিকহি দলিল
মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ-এর ৫৭২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে,
لَوْ أُطْلِقَ الْعَقْدُ حِينَ الِاسْتِئْجَارِ، فَلِلْأَجِيرِ أَنْ يَسْتَعْمِلَ غَيْرَهُ.
অর্থ: নিয়োগ বা সেবার চুক্তি শর্তহীনভাবে সম্পাদিত হলে, নিযুক্ত ব্যক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিতে পারেন।
একই গ্রন্থের ৫৭৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি দর্জিকে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পোশাক সেলাই করতে বলেন, কিন্তু দর্জি নিজ হাতে সেলাই করবেন—এমন শর্ত না করেন, তাহলে দর্জি অন্য দর্জির মাধ্যমে কাজটি করিয়ে নিলেও নির্ধারিত পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকারী হবেন।
এ থেকে বোঝা যায়, চুক্তিতে ব্যক্তিগতভাবে কাজ সম্পাদনের শর্ত না থাকলে এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অন্যের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করাতে পারেন।
(মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, ধারা: ৫৭২–৫৭৩)
সারকথা
আপনি যদি গ্রাহকের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা সরবরাহের চুক্তি করেন এবং নিজ দায়িত্বে অন্য কোনো বৈধ সরবরাহকারীর মাধ্যমে তা সরবরাহ করেন, তাহলে চুক্তির প্রকৃতি ও শর্ত অনুযায়ী এ লেনদেন জায়েজ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ গ্রহণ করলে তা ব্যবসায়িক মুনাফা বা সেবামূল্য হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে আপনি যদি গ্রাহকের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন, তাহলে কমিশন বা পারিশ্রমিকের বিধান আলাদা হবে। তাই লেনদেনের প্রকৃতি ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শরয়ি বিধান নির্ধারণ করতে হবে।
সূত্র: মুসলিম বাংলা

-6aca36de2f5ad.jpg)
-6ac91b932100c.jpg)