Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া পালিয়ে বিয়ে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া পালিয়ে বিয়ে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

Advertisement

সমসাময়িক সমাজে প্রেম ও বিবাহের প্রশ্নে এক অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি হয়েছে একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার জোরালো দাবি, অন্যদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম। 

এই দ্বন্দ্বের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে পালিয়ে বিয়ের প্রবণতা, যা অনেকের কাছে ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি গভীরভাবে পর্যালোচনাযোগ্য একটি বিষয়।

কারণ ইসলাম ভালোবাসাকে অস্বীকার করে না, কিন্তু সেই ভালোবাসার পরিণতি কীভাবে বৈধ, সম্মানজনক ও স্থিতিশীল হবে সেই পথনির্দেশই প্রদান করে। 

ইসলামে বিবাহ কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি, যা পরিবার, বংশধারা এবং নৈতিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর। (সুরা আন-নিসা ২৫) 

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, বিবাহে অভিভাবকের সম্পৃক্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যা সম্পর্ককে সুরক্ষিত ও সুসংহত করে। 

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে সম্পন্ন কর। (সুরা আন-নূর ৩২) 

এখানে সমাজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিবাহকে সহজ করা, বৈধ পথে প্রতিষ্ঠিত করা। অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে বিয়ে হবে প্রকাশ্য, সম্মানজনক এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত। 

রাসুলুল্লাহ সা. এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ নয়। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৮৫, তিরমিজি, হাদিস নং ১১০১) 

অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেন, যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল। (তিরমিজি, হাদিস নং ১১০২, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৮৭৯) 

এই বাণীগুলো ইসলামী শরীয়তে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি অপরিহার্য। 

এছাড়াও বিয়েকে প্রকাশ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, বিয়েকে প্রকাশ করো। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং ১৬১৩০) 

এই নির্দেশনার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক প্রজ্ঞা গোপন সম্পর্ক সমাজে সন্দেহ, অপবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথ খুলে দেয়। 

এই প্রেক্ষাপটে পালিয়ে বিয়ে ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে একটি স্পষ্ট সংঘাত সৃষ্টি করে। কারণ এতে অভিভাবকের অনুমতি অনুপস্থিত থাকে, বিয়ে গোপন রাখা হয় এবং পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে সম্পর্কটি শুরু থেকেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করে। 

ইসলামী ফিকহের বিশিষ্ট ইমামরা এই বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত দিয়েছেন। ইমাম মালিক তার মুয়াত্তা গ্রন্থে উল্লেখ করেন ওয়ালির অনুমতি ছাড়া বিয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। 

ইমাম শাফেয়ী তার আল-উম্ম-এ বলেন, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে বাতিল। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর মতও একই বিবাহের বৈধতার জন্য ওয়ালি অপরিহার্য শর্ত। 

ইমাম নববী তার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, অধিকাংশ আলেম একমত যে, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সহিহ নয়। ইমাম ইবনে কুদামা তার আল-মুগনী গ্রন্থে বলেন, এই বিষয়ে সাহাবিদের আমলও একই ছিল তারা অভিভাবক ছাড়া বিয়েকে অনুমোদন দিতেন না। 

তবে ইমাম আবু হানিফা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন। তার মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেচনাশীল নারী নিজেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যদি পাত্র তার সমমানের হয়। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা সম্পর্ককে অধিক নিরাপদ ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। 

হানাফি ফিকহ গ্রন্থ আল-হিদায়া-তেও এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। 

পালিয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের আপত্তির মূল কারণ কেবল অনুমতির অভাব নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সামাজিক ও নৈতিক ঝুঁকি। 

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব, ভবিষ্যৎ পারিবারিক জটিলতা এসবই একটি সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে। ইসলাম যে বিবাহব্যবস্থা চায়, তা হলো এমন এক সম্পর্ক, যা সমাজে মর্যাদাপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে। 

তবে ইসলাম ন্যায়বিচারের ভারসাম্যও বজায় রাখে। যদি কোনো অভিভাবক অন্যায়ভাবে একটি উপযুক্ত বিয়েকে বাধাগ্রস্ত করেন, তাহলে শরীয়ত বিকল্প পথের অনুমতি দেয়। সে ক্ষেত্রে কাজী বা ইসলামি বিচারক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন, যাতে একটি বৈধ সম্পর্ক অন্যায়ের কারণে বন্ধ না হয়ে যায়। 

পরিশেষে বলা যায়, পালিয়ে বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো আদর্শ পথ নয়, বরং এটি আবেগনির্ভর একটি সিদ্ধান্ত, যা প্রায়শই বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে না। 

ইসলাম যে পথ দেখায়, তা হলো স্বচ্ছতা, দায়িত্ব এবং সামাজিক স্বীকৃতির পথ যেখানে ভালোবাসা শৃঙ্খলার মধ্যে বিকশিত হয় এবং সম্পর্ক আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। 

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

খাঁটি তওবার সঠিক নিয়ম ও ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

খাঁটি তওবার সঠিক নিয়ম ও ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কি সঠিক?

‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কি সঠিক?

কলকাতায় একাধিক বিয়ে করলেই যাবে সরকারি চাকরি

কলকাতায় একাধিক বিয়ে করলেই যাবে সরকারি চাকরি

দাম্পত্যে কথা কমে, বাড়ে দূরত্ব— এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন?

দাম্পত্যে কথা কমে, বাড়ে দূরত্ব— এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন?

আরও পড়ুন

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম