Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

জার্মানির মুসলমানদের ইতিহাস: শ্রম ও সংগ্রামের এক বিস্ময়কর অধ্যায়

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম

জার্মানির মুসলমানদের ইতিহাস: শ্রম ও সংগ্রামের এক বিস্ময়কর অধ্যায়

কোলন কেন্দ্রীয় মসজিদ, জার্মানি। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আজকের আধুনিক, সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর জার্মানিকে দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে— এ দেশের ইতিহাস কেবল ইউরোপীয় সভ্যতার ধারাবাহিকতার গল্প। কিন্তু ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, স্থাপত্য ও শ্রম জার্মানির বিকাশে গভীর প্রভাব রেখে গেছে। অথচ সেই অবদানের অনেকটাই আজ বিস্মৃত। জার্মানির ইতিহাসের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক কেবল অভিবাসনের নয়; এটি পারস্পরিক আদান-প্রদান, সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার গল্প।

জার্মানির মাটিতে ইসলামের শিকড় বহু পুরোনো

জার্মানির কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী অর্থনীতি, বিশ্বখ্যাত গাড়ি শিল্প কিংবা ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রের ছবি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই জার্মানির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, স্থাপত্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী পুরোনো।

কখনো আব্বাসীয় খলিফার উপহার হিসেবে রাজদরবারে পৌঁছেছে একটি হাতি, কখনো মুসলিম পণ্ডিতরা জ্ঞানচর্চার আলো ছড়িয়েছেন ইউরোপীয় সম্রাটদের দরবারে, আবার কখনো লাখো মুসলিম শ্রমিক নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে। তবু আজও দেশটির মুসলিম সমাজকে নানা ধরনের বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।

আপনি কি জানতেন, ১৮৬৭ সালের প্যারিস প্রদর্শনীতে (Paris Exposition) প্রুশিয়া নিজের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি মসজিদকে বেছে নিয়েছিল? কিংবা বাভারিয়ার ‘সোয়ান কিং’ দ্বিতীয় লুডভিগ তাঁর প্রজাদের সঙ্গে দেখা করার সময় সুলতানের পোশাক পরতে ভালোবাসতেন, যার সঙ্গে থাকত সিসা পাইপ আর খেজুরের তৈরি কেক? খোদ শার্লেমেন নিজের কাছে ‘আবু আব্বাস’ নামের একটি হাতি রাখতেন, যা ছিল আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের দেওয়া উপহার। অন্যদিকে, মুসলিম গণিতবিদ ও দার্শনিকেরা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের দরবারে অত্যন্ত সমাদৃত শিক্ষক ছিলেন এবং প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীতেও একটি তাতার ইউনিট কর্মরত ছিল।

ইতিহাসের যে দিকেই তাকানো হোক না কেন, জার্মানির অতীত ইসলামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাভারিয়ান স্টেট অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রিজারভেশন অব লোকাল হিস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুডলফ নিউমায়ারও একই মত প্রকাশ করেছেন। ‘ইসলামবেরাটুং বায়ার্ন’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি বলেন, ‘স্বদেশ মানেই বৈচিত্র্য; যা কিছু এখানে আছে, তার সবকিছু নিয়েই আমাদের এই ঘর। আর ইসলাম এখানে রয়েছে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে।’

ভাষাতেও রয়েছে সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ছাপ। ইংরেজির মতো জার্মান ভাষাও ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে শতাব্দীব্যাপী সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। আরবি উপসর্গ ‘আল’ (al)-যুক্ত অসংখ্য শব্দ—যেমন অ্যালকোহল (Alkohol), অ্যালজেব্রা (Algebra), অ্যালম্যানাক (Almanach) এবং অ্যালগরিদম (Algorithmus)—প্রমাণ করে, আরব মুসলিম গণিতবিদ ও দার্শনিকদের হাত ধরেই এসব শব্দ ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করেছে।

জার্মানি বিনির্মাণে মুসলিমদের শ্রম ও অবদান

গ্যোতের ওয়েস্ট-ইস্টার্ন ডিভান থেকে শুরু করে মোৎসার্টের দ্য অ্যাবডাকশন ফ্রম দ্য সেরাগ্লিও কিংবা কার্ল মে-র ওরিয়েন্ট সাইকেল—জার্মান সাহিত্য ও সংগীতে প্রাচ্যের প্রভাব স্পষ্ট। একইভাবে শ্বেতজিঙ্গেন প্যালেস গার্ডেনের লাল মসজিদ, বার্লিনের নিউ সিনাগগ কিংবা ড্রেসডেনের ঐতিহাসিক ‘ইয়োনিদজে’ ভবনও সেই সাংস্কৃতিক প্রভাবের নীরব সাক্ষী। ১৮ ও ১৯ শতকে জার্মানদের কাছে ‘ওরিয়েন্ট’ ছিল অনুপ্রেরণা, কৌতূহল ও সৌন্দর্যের এক অনন্য উৎস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জার্মানিকে পুনর্গঠনের যে অর্থনৈতিক বিস্ময়—‘ভিরশাফটসভুন্ডার’ (Wirtschaftswunder)—তার পেছনেও ছিল মুসলিম শ্রমিকদের অসামান্য অবদান। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ‘অতিথি কর্মী’ জার্মানিতে আসেন। তাদের একটি বড় অংশ ছিলেন তুরস্ক, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া, মরক্কো ও তিউনিসিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে।

আজ তাদের পরবর্তী প্রজন্ম জার্মান অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ধর্মনিরপেক্ষ ও আলেভি সম্প্রদায়সহ কেবল তুর্কি বংশোদ্ভূতরাই বর্তমানে ৮০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে চার লাখেরও বেশি মানুষের। একই সঙ্গে তারা জার্মানি ও তাদের পূর্বপুরুষের জন্মভূমির মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন।

সামাজিক মূল্যবোধে মুসলিমদের সক্রিয় উপস্থিতি

পরিসংখ্যান বলছে, মুসলিমদের ছাড়া বর্তমান জার্মান সমাজকে কল্পনা করাই কঠিন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৫৩ থেকে ৫৬ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা জার্মানির বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

জার্মানির প্রথম ইসলামিক উপদেষ্টা হুসেইন হামাদান দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সমাজ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। তার ভাষায়, ‘জার্মান মুসলিমরা রাজনীতি, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ইসলাম এখন জার্মানির বাস্তবতারই একটি অংশ।’

স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ড ও দাতব্য কাজেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের সাবেক প্রকল্প অংশীদার আয়তেন কিলিচারসলান বলেন, ‘মুসলিমরা শুধু নিজেদের কমিউনিটির জন্য নয়, বরং স্কুল, সামাজিক সংগঠন, খেলাধুলা, প্রবীণ মানুষ, প্রতিবেশী এবং শরণার্থীদের সহায়তায়ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।’ তার নেতৃত্বাধীন নারীদের পরিচালিত দাতব্য সংস্থা ‘সোশ্যালডিন্সট মুসলিমশার ফ্রয়েন (SmF)’-এর সঙ্গে বর্তমানে ১,৩০০-এরও বেশি মানুষ যুক্ত রয়েছেন।

বৈষম্য যেন এখনো মুসলিমদের নিত্যসঙ্গী

অবদানের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও জার্মানিতে ইসলামভীতি ও মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের পাশাপাশি CLAIM এবং জার্মান ফেডারেল অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন এজেন্সির প্রতিবেদনেও এই প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া যায়। জনপরিসরে মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং মুসলিমবিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দিচ্ছে।

রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের অভিবাসী সমাজবিষয়ক সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার ভলকার নুসকে বলেন, ‘বিশেষ করে হিজাব পরিহিত নারীরা প্রায়ই হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।’ তিনি জার্মান সমাজে মুসলিমদের দৃশ্যমানতা, সমঅধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

জার্মানির ইতিহাস কেবল রাজা-সম্রাট, যুদ্ধ কিংবা শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস নয়; এটি বহু সংস্কৃতি, বহু জাতি ও বহু ধর্মের সম্মিলিত অবদানের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে মুসলিমদের ভূমিকা যেমন জ্ঞানচর্চায়, তেমনি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, স্থাপত্য ও সমাজ গঠনের প্রতিটি স্তরেই স্পষ্ট। কিন্তু অবদান যত বড়ই হোক, বৈষম্য ও ইসলামভীতির বাস্তবতা এখনো অনেক মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ইতিহাস তাই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যেই নিহিত। আর জার্মানির ইতিহাসে মুসলিমদের উপস্থিতি সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

— রবার্ট বোশ স্টিফটুং ডটডিই অবলম্বনে

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি, চ্যান্সেলরের পদত্যাগ দাবি

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি, চ্যান্সেলরের পদত্যাগ দাবি

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল আরেক দেশ

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল আরেক দেশ

কোমল পানীয়ের ওপর ‘চিনি কর’ আরোপ করছে জার্মানি

কোমল পানীয়ের ওপর ‘চিনি কর’ আরোপ করছে জার্মানি

জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরির ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে যুবক

জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরির ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে যুবক

যেভাবে উদ্ধার হলো জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া সেই ল্যাপটপ

যেভাবে উদ্ধার হলো জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া সেই ল্যাপটপ

জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার

জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার

আরও পড়ুন

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

কেউ যদি বলে— ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন!’ তখন করণীয় কী?

কেউ যদি বলে— ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন!’ তখন করণীয় কী?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম