দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধু-স্বজনের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— খাবার খাওয়ার পর আয়োজককে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? কেউ সৌজন্যবশত কিছু অর্থ দিতে চান, আবার কেউ মনে করেন, দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া ঠিক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি নির্ভর করে অর্থ দেওয়ার উদ্দেশ্য, আয়োজকের সম্মতি এবং প্রচলিত রীতির ওপর।
ইসলামে অতিথিকে সম্মান করা এবং মেহমানদারি করা প্রশংসনীয় কাজ। তবে দাওয়াত খাওয়ার পর স্বেচ্ছায় টাকা দেওয়া বা উপহার দেওয়াও নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে এটিকে খাবারের মূল্য হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নাকি উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে— তা গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে তা বৈধ।’
এছাড়া সহিহ বুখারির ৬১৩৫ নম্বর হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’
হাদিসে অতিথিকে এক দিন ও এক রাত বিশেষভাবে আপ্যায়ন এবং তিন দিন পর্যন্ত মেহমানদারির কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, অতিথিকে আপ্যায়ন করা আয়োজকের পক্ষ থেকে সম্মান ও উত্তম আচরণের অংশ; এটি সাধারণত খাবারের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার বিষয় নয়।
অন্যদিকে, উপহার দেওয়া ও গ্রহণেরও ইসলামে উৎসাহ রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং এর প্রতিদানও দিতেন। সহিহ বুখারির ২৫৮৫ নম্বর হাদিসে এ বর্ণনা এসেছে। ফলে দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় অর্থ বা উপহার দেওয়া বৈধ হওয়ার পক্ষে এ হাদিস থেকে সমর্থন পাওয়া যায়।
হানাফি ফিকাহর আলোচনায় উপহার দেওয়া ও গ্রহণ করাকে উত্তম সামাজিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উপহার মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করে। তবে উপহার এমন হওয়া উচিত নয়, যা দাতা বা গ্রহীতার ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে।
এ বিষয়ে কয়েকটি পরিস্থিতি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন—
- স্বেচ্ছায় অর্থ দেওয়া: দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে বা আয়োজকের খরচে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে নিজের ইচ্ছায় টাকা দিলে তা উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে জায়েজ।
- আগে থেকে অর্থ দেওয়ার শর্ত থাকলে: দাওয়াতের আগে যদি জানানো হয় যে প্রত্যেক অতিথিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, তাহলে সেটি পারস্পরিক সম্মতিতে আয়োজিত খাবারের অনুষ্ঠান বা যৌথ খরচের বিষয়। সম্মতি ছাড়া কাউকে এ অর্থ দিতে বাধ্য করা যাবে না।
- আয়োজক টাকা চাইলে: সাধারণ দাওয়াতের পর খাবারের মূল্য দাবি করা এবং আগে থেকে সম্মত হওয়া অর্থ চাওয়া এক বিষয় নয়। আগে থেকে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা না থাকলে অতিথির ওপর খাবারের মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।
- লোকদেখানো বা চাপের কারণে টাকা দেওয়া: সামাজিক চাপ, লজ্জা কিংবা বাধ্যবাধকতার কারণে অর্থ দিতে হলে সেটি প্রকৃত স্বেচ্ছা উপহার নয়।
হানাফি ফিকাহবিষয়ক দারুল ইফতা বার্মিংহামের একটি ফতোয়ায় সাধারণ দাওয়াত ও বিয়ের দাওয়াতে অংশগ্রহণের বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, দারুল ইফতা জাম্বিয়ার ফতোয়ায় খাবারের আয়োজন ও মাথাপিছু খরচের বিষয়ে পূর্বসম্মতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তাহলে সিদ্ধান্ত কী?
দাওয়াত খেয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় টাকা দেওয়া জায়েজ। তবে এটিকে খাবারের বাধ্যতামূলক মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, যদি আগে থেকে এমন কোনো সমঝোতা না থাকে। একইভাবে আয়োজকও অতিথির কাছ থেকে স্বাভাবিক দাওয়াতের খাবারের মূল্য দাবি করতে পারেন না।
