ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে, ঘুম ও মৃত্যুর রহস্য কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমরা প্রতিদিন ঘুমাতে যাই, আবার সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠি। আমাদের কাছে এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, ঘুমের সময় আমাদের রূহের কী অবস্থা হয়? ঘুমের মধ্যে কি রূহ শরীর থেকে বের হয়ে যায়? রূহ কি কোথাও চলে যায়? আবার ঘুম ভাঙলে কীভাবে তা শরীরে ফিরে আসে?
বিষয়টি শুধু কৌতূহলের নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা, জীবন ও মৃত্যুর রহস্য এবং মানুষের সীমিত জ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পবিত্র কুরআনে ঘুম ও মৃত্যুর মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কয়েকটি হাদিসেও ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ কবজ করা, ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঘুমানোর আগে ও পরে পাঠ করার দোয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাহলে ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে? এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিস কী জানায়? চলুন, দলিলের আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।
১. রূহ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান কতটুকু?
রূহ মানুষের জীবনের অত্যন্ত রহস্যময় একটি বিষয়। মানুষ তার শরীর সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলেও রূহের প্রকৃত স্বরূপ ও রহস্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান রাখে না। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলেন—
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ ۖ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
‘তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, রূহ আমার রবের আদেশঘটিত বিষয়। আর তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৮৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রূহের প্রকৃত স্বরূপ মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে। তাই রূহ সম্পর্কে এমন কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত নয়, যার পক্ষে কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
২. ঘুমের সময় আল্লাহ মানুষের রূহ কবজ করেন
ঘুমের সময় মানুষের রূহের অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াতটি রয়েছে সুরা আয-যুমারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়। আর যারা মারা যায়নি, তাদের প্রাণও হরণ করেন ঘুমের সময়। অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ আটকে রাখেন। আর অন্যদের প্রাণ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৪২)
এই আয়াত থেকে জানা যায়, ঘুম ও মৃত্যুর সময় আল্লাহ মানুষের প্রাণ কবজ করেন। তবে ঘুম ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়ে গেছে, আল্লাহ তার প্রাণ আটকে রাখেন। আর যার মৃত্যুর সময় এখনো আসেনি, আল্লাহ তার প্রাণ ফিরিয়ে দেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। অর্থাৎ প্রতিদিনের ঘুম ও জাগরণ আল্লাহর কুদরত ও নিয়ন্ত্রণেরই একটি নিদর্শন।
৩. ঘুম ও জাগরণ সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন
শুধু সুরা আয-যুমারেই নয়, সুরা আল-আনআমেও ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ গ্রহণ এবং দিনের বেলায় জাগিয়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُم بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَىٰ أَجَلٌ مُّسَمًّى ۖ ثُمَّ إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ ثُمَّ يُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
‘তিনিই রাতে তোমাদের প্রাণ গ্রহণ করেন এবং দিনে তোমরা যা করো, তা জানেন। অতঃপর দিনে তোমাদের জাগিয়ে তোলেন, যাতে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়। তারপর তার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যা করতে, সে সম্পর্কে তিনি তোমাদের অবহিত করবেন।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ৬০)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ঘুমিয়ে পড়া কিংবা ঘুম থেকে জেগে ওঠা—কোনোটিই মানুষের সম্পূর্ণ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে নয়। জীবন ও মৃত্যুর মতো ঘুম ও জাগরণও আল্লাহর ক্ষমতার অধীন।
৪. ঘুমের সময় আল্লাহ রূহ কবজ করেন
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনা রয়েছে। এক সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাহাবিরা ফজরের নামাজের সময় ঘুমিয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করলে হজরত বিলাল (রা.) তাদের জাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনিও ঘুমিয়ে পড়েন। পরে সূর্য ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) জেগে ওঠেন এবং বিলাল (রা.)-কে বলেন, ‘হে বিলাল! তোমার প্রতিশ্রুতির কী হলো?’ এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
إِنَّ اللَّهَ قَبَضَ أَرْوَاحَكُمْ حِينَ شَاءَ، وَرَدَّهَا حِينَ شَاءَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন, তখন তোমাদের রূহ কবজ করে নিয়েছেন এবং যখন ইচ্ছা করেছেন, তখন তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। (বুখারি ৫৯৫, ৭৪৭১; মুসলিম ৬৮১)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঘুমের সময় মানুষের রূহ কবজ করা এবং ফিরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। মানুষ কখন ঘুমাবে, কখন জাগবে—সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে।
৫. ঘুমানোর আগে নবীজির (সা.) দোয়া
ঘুমাতে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যেখানে ঘুমের সময় প্রাণ আটকে রাখা ও ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যাবে, তখন সে যেন এই দোয়া পড়ে—
بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي، وَبِكَ أَرْفَعُهُ، إِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ
উচ্চারণ: ‘বিসমিকা রব্বি ওয়াদাতু জানবি, ওয়া বিকা আরফাউহু। ইন আমসাকতা নাফসি ফারহামহা, ওয়া ইন আরসালতাহা ফাহফাজহা বিমা তাহফাজু বিহি ইবাদাকাস সালিহিন।’
অর্থ: ‘হে আমার রব! আপনার নামেই আমি আমার পার্শ্ব রাখলাম এবং আপনার নামেই তা উঠাব। যদি আপনি আমার প্রাণ আটকে রাখেন, তবে তার প্রতি দয়া করুন। আর যদি তা ফিরিয়ে দেন, তবে আপনার নেক বান্দাদের যেভাবে হেফাজত করেন, সেভাবে তাকে হেফাজত করুন।’ (বুখারি ৬৩২০)
কী চমৎকার একটি দোয়া! মানুষ যখন ঘুমাতে যায়, তখন সে জানে না সকালে তার ঘুম ভাঙবে কি না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, কিভাবে ঘুমানোর আগে নিজের জীবন ও প্রাণকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে।
৬. ঘুমের দোয়ায় রয়েছে মৃত্যুর স্মরণ
ঘুম থেকে জেগে ওঠার দোয়ায়ও রয়েছে মৃত্যুর স্মরণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পাঠ করতেন। তাতে এসেছে, হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ঘুম থেকে জেগে উঠতেন, তখন বলতেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
উচ্চারণ: ‘আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা'দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।’
অর্থ: ‘সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন। আর তার কাছেই আমাদের পুনরুত্থান।’ (বুখারি ৬৩১২)
এখানে ঘুমকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করে আমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। কারণ গত রাতে ঘুমাতে যাওয়া প্রত্যেক মানুষ জানে না, পরদিন সকালে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
৭. ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে?
এবার আসা যাক মূল প্রশ্নে— ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে? পবিত্র কুরআন থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ ঘুমের সময় মানুষের প্রাণ কবজ করেন এবং যার মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়নি, তার প্রাণ আবার ফিরিয়ে দেন। কিন্তু ঘুমের সময় রূহ ঠিক কোথায় অবস্থান করে, কোন স্থানে থাকে কিংবা কীভাবে শরীরের সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় থাকে—এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিস্তারিত কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি।
তাই রূহ ঘুমের সময় আকাশে চলে যায়, নির্দিষ্ট কোনো স্থানে অবস্থান করে কিংবা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়— এমন কোনো বক্তব্যকে নিশ্চিত ইসলামী তথ্য হিসাবে প্রচার করা ঠিক হবে না। একইভাবে, ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে সাময়িক জাগরণ কিংবা আবার ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে রূহের কবজ ও প্রত্যাবর্তনের কী সম্পর্ক, সেটিও দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।
আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা যেভাবে জানিয়েছেন, বিষয়টি সেভাবেই সত্য। এর প্রকৃত ধরন, অবস্থান ও রহস্য একমাত্র তিনিই ভালো জানেন।
৮. ঘুম ও জাগরণ থেকে আমাদের শিক্ষা
ঘুম শুধু শারীরিক বিশ্রামের মাধ্যম নয়; বরং এটি মানুষের জন্য আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন। প্রতিটি রাত আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর প্রতিটি সকাল নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। এ থেকে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত—
- ঘুমানোর আগে দোয়া পড়া: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো ঘুমের দোয়া পাঠ করে ঘুমাতে যাওয়া।
- আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা: নিজের জীবন, মৃত্যু ও সবকিছু আল্লাহর হাতে—এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা।
- তাওবা ও ইস্তিগফার করা: ঘুমানোর আগে নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- ঘুম থেকে উঠে শুকরিয়া আদায় করা: নতুন একটি সকাল ও জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করা।
- আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া: প্রতিদিনের ঘুম ও জাগরণ থেকে মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের কথা স্মরণ করা।
প্রিয় পাঠক! একটু চিন্তা করে দেখুন, প্রতিদিন রাতে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই। প্রতিটি ঘুম আমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ আমরা জানি না, পরদিন সকালে আমাদের ঘুম ভাঙবে কি না। কত মানুষ রাতে ঘুমাতে গিয়ে আর কখনো জেগে ওঠেনি! আবার কত মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন করে জীবন পেয়েছে।
পবিত্র কুরআন আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, ঘুম ও মৃত্যুর সময় মানুষের প্রাণ গ্রহণ করেন আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা ফিরিয়ে দেন, আর যার মৃত্যুর ফয়সালা করেন, তার প্রাণ আটকে রাখেন।
তাই ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ করুন, তার কাছে ক্ষমা চান এবং নিজের জীবনকে তার কাছে সোপর্দ করুন। ঘুম থেকে জেগে উঠলে তার শুকরিয়া আদায় করুন। মনে রাখবেন, প্রতিটি নতুন সকাল আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া— নিজেকে সংশোধন করার, নেক আমল বাড়ানোর এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার একটি নতুন সুযোগ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ইমানের সঙ্গে জীবন যাপন করার, তার স্মরণে রাত কাটানোর এবং ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।


