কথা-কাজে কষ্ট পেলেও কি গুনাহ মাফ হয়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের জীবন কখনো সুখের, কখনো দুঃখের। কখনো হাসি-আনন্দে কেটে যায় দিন, আবার কখনো অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, হতাশা, বিষণ্ণতা কিংবা নানা বিপদ-আপদে ভারী হয়ে ওঠে হৃদয়। কিছু কষ্ট মানুষকে নীরবে কাঁদায়, কিছু কষ্ট কাউকে বলা যায় না, আবার কিছু যন্ত্রণা এমন থাকে, যা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
কিন্তু একজন মুমিনের জন্য আশার বিষয় হলো, তার কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে অর্থহীন নয়। ধৈর্য ও ইমানের সঙ্গে সহ্য করা জীবনের প্রতিটি বিপদ-আপদ তার গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এমনকি শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও তার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সুবহানাল্লাহ!
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি সুসংবাদ দিয়েছেন, যা বিপদে-আপদে মুমিনের হৃদয়ে সান্ত্বনা ও আশার আলো জ্বালায়।
১. কষ্ট মুমিনের জন্য গুনাহ মাফের উপায়
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি তার শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১–৫৬৪২, মুসলিম ২৫৭৩)
হাদিসটি আমাদের শেখায়, মুমিনের জীবনের ছোট-বড় কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। মানুষের চোখে যে যন্ত্রণা সামান্য, আল্লাহর রহমতে সেটিও তার গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।
২. বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য পরীক্ষা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন—
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত। আর তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫–১৫৭)
এই আয়াতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন পরীক্ষার জায়গা। বিপদ আসা মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নয়। বরং অনেক সময় বিপদের মধ্য দিয়েই আল্লাহ তার বান্দাকে পরীক্ষা করেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং তার জন্য কল্যাণের পথ খুলে দেন।
৩. কষ্টের পরেই রয়েছে স্বস্তির সুসংবাদ
কষ্টের মুহূর্তে মানুষ অনেক সময় ভেঙে পড়ে। মনে হয়, এই দুঃসময় বুঝি আর শেষ হবে না। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন—
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আলাম নাশরাহ: আয়াত ৫–৬)
কী অপূর্ব আল্লাহর প্রতিশ্রুতি! তাই কোনো বিপদে হতাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং তার রহমতের অপেক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাত যত গভীরই হোক, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই ভোরের আলো নিয়ে আসতে পারেন।
৪. মুমিনের প্রতিটি অবস্থাতেই রয়েছে কল্যাণ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
‘মুমিনের ব্যাপারটি সত্যিই বিস্ময়কর! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। তার জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
সুতরাং একজন প্রকৃত মুমিন সুখের সময় অহংকারী হয় না, আবার দুঃখের সময় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশও হয় না। সে সুখে শুকরিয়া আদায় করে এবং দুঃখে সবর করে। এভাবেই তার জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি ইবাদতে পরিণত হয়।
৫. কষ্টের সময় আমাদের করণীয়
জীবনে বিপদ-আপদ আসলে একজন মুমিনের উচিত—
- সবর করা: বিপদের সময় অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করা।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা: মনে রাখা, তিনিই বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা রাখেন।
- ইস্তিগফার করা: বেশি বেশি اَسْتَغْفِرُ الله আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
- দোয়া করা: বিপদ থেকে মুক্তি, মানসিক প্রশান্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
- আশাবাদী থাকা: কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।
- প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা: অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া এবং সমস্যার সমাধানে বৈধ ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা। কারণ সবর মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
কষ্টের মাঝেও আল্লাহর রহমতের আশা রাখুন
প্রিয় মুমিন ভাই ও বোনেরা! জীবনে যত কষ্টই আসুক, কখনো হতাশ হবেন না। আপনার চোখের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, অসুস্থতার প্রতিটি মুহূর্ত, মনের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষা আল্লাহ জানেন। মানুষের কাছে আপনার কষ্টের মূল্য না থাকলেও আল্লাহর কাছে তা অজানা নয়।
হয়তো যে অসুস্থতা আপনাকে বিছানায় শুইয়ে রেখেছে, সেটিই আপনার গুনাহ মাফের কারণ হচ্ছে। হয়তো যে দুশ্চিন্তায় আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, সেটিই আপনার পাপ মোচনের উসিলা হচ্ছে। হয়তো যে কষ্টে আপনি নীরবে কাঁদছেন, তার বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে আখিরাতে বিশেষ প্রতিদান দেবেন।তাই বিপদে ভেঙে পড়বেন না। সবর করুন, নামাজে দাঁড়ান, আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলুন এবং তাঁর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখুন।
মনে রাখবেন, মুমিনের জীবনে কষ্ট আসতে পারে, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত, গুনাহ মাফের সুযোগ এবং আখিরাতের কল্যাণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে গুনাহ মাফের উসিলা বানিয়ে দিন। বিপদে ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন। অসুস্থদের শিফা দান করুন, দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

