ইচ্ছাকৃত নামাজ কাজা করলে ক্ষমা পাওয়া যাবে কি?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনের ব্যস্ততা আর তদারকির ফাঁকে কখনো কখনো অজান্তে বা আলস্যে ছুটে যায় আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সুবর্ণ সময়—নামাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কাজা করার অভ্যাসটা যদি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে কি মালিকের দরবারে ক্ষমার কোনো দরজা খোলা থাকবে? আসুন, পবিত্র কুরআন ও হাদিসের স্নিগ্ধ আলোয় খুঁজে দেখি আমাদের এই আত্মিক প্রশ্নের জবাব।
নিয়মিত নামাজ কাজা করার পরিণতি ও ক্ষমার দরজা
ইসলামে নামাজ হলো বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সংযোগের মাধ্যম। ইচ্ছাকৃতভাবে সময় পার করে দিয়ে নিয়মিত নামাজ কাজা করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। নামাজের একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন—
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا
‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১০৩)
এই আয়াতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ওয়াক্তে নামাজ আদায় করাই ইবাদতের মূল সৌন্দর্য। যদি কেউ নিয়মিত ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াক্ত পার করে দিয়ে কাজা করে, তবে তা কবিরা গুনাহ বা বড় অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
নামাজ ওয়াক্তমতো না পড়ার বিপদ
হাদিস শরিফে ওয়াক্ত পেরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ ত্যাগের পরিণতির কথা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। হজরত বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّركِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ
‘ব্যক্তি এবং কুফরি ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।’ (মুসলিম ১৪৭)
এখানে ‘ছেড়ে দেওয়া’ বলতে নামাজকে অস্বীকার করা যেমন কুফরি, তেমনি অলসতা বা নিয়মিত কাজা করার মাধ্যমে নামাজকে অবহেলা করাও ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করে।
তবে কি তওবা করলে ক্ষমা মিলবে?
আল্লাহ তাআলার রহমত এত বিশাল যে, বান্দা যতই বড় ভুল করুক না কেন, সে যদি আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, তবে ক্ষমা পাওয়া সম্ভব। বান্দার যেকোনো অপরাধের ক্ষমা পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো (খাঁটি) ‘তওবা’। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩)
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মুখে ক্ষমা চাইলেই তওবা পূর্ণ হয় না। প্রকৃত তওবার জন্য প্রয়োজন—
- অতীতের নামাজ ছেড়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া।
- ভবিষ্যতে আর ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে না দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
- অবিলম্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় শুরু করা।
- অতীতের ছুটে যাওয়া নামাজের বিষয়ে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা।
আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে হবে, আবার নিজের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে।
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا
‘যে ব্যক্তি নামাজ পড়তে ভুলে যায় কিংবা ঘুমিয়ে পড়ে (যার ফলে ওয়াক্ত পার হয়ে যায়), তবে তার কাফফারা হলো— যখনই তার মনে পড়বে, সে যেন তা আদায় করে নেয়।’ (মুসলিম ৬৮৪)
যদিও এই হাদিসটি মূলত ভুলবশত বা ঘুমিয়ে পড়ার কারণে কাজা হওয়া সম্পর্কে, তবুও উলামায়ে কেরামের মতে ইচ্ছাকৃত কাজা করা ব্যক্তির জন্যও তওবা করে কাজাগুলো আদায় করা জরুরি।
জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত, আর আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়া অনিবার্য। নিয়মিত নামাজ কাজা করার বদভ্যাস কেবল দুনিয়াতে ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয় না, বরং আখিরাতের প্রস্তুতিকেও বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। তাই আজই আলস্যের চাদর ছুঁড়ে ফেলে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। তওবা করুন, ওয়াক্তমতো নামাজ আদায় করার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, মালিকের দরজা রহমতের জন্য সব সময় খোলা থাকে, প্রয়োজন শুধু বান্দার একটু বিশ্বাসের ডাক।

