যে ৫ উপায়ে গড়ে ওঠে সুখী ও বরকতময় সংসার
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংসার শুধু একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, ত্যাগ, আস্থা ও আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ হলো ইমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং একটি আদর্শ পরিবার গড়ে তোলার সর্বোত্তম মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী যখন কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরস্পরের অধিকার আদায় করেন, তখন সেই সংসারে নেমে আসে শান্তি (সাকীনাহ), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও রহমত (রাহমাহ)। আর এ তিনটি গুণই একটি সুখী ও বরকতময় পরিবারের মূল ভিত্তি।
নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তুলে ধরা হলো—
১. দ্বীনদার ও উত্তম জীবনসঙ্গী নির্বাচন
সুখী সংসারের সূচনা হয় সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে। ইসলাম বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদার চেয়ে দ্বীনদারিতা ও উত্তম চরিত্রকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ একজন নেককার জীবনসঙ্গী শুধু একজন ভালো স্বামী বা স্ত্রীই নন, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও উত্তম অভিভাবক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
‘নারীকে চারটি বিষয়ের কারণে বিবাহ করা হয়—তার সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারিতার জন্য। অতএব, তুমি দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও; তবেই সফল হবে।’ (বুখারি ৫০৯০, মুসলিম ১৪৬৬)
২. পরস্পরের ‘পোশাক’ হওয়া
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্ককে ‘পোশাক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৭)
পোশাক যেমন দেহকে আচ্ছাদিত করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং নিরাপত্তা দেয়, তেমনি স্বামী-স্ত্রীরও উচিত একে অপরের দুর্বলতা গোপন রাখা, সম্মান রক্ষা করা এবং বিপদে-আপদে পরস্পরের আশ্রয় হয়ে ওঠা।
৩. ভালোবাসা, প্রশান্তি ও রহমতের বন্ধন
ইসলামে বিবাহের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জন। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা একে অপরের জীবনের শান্তির ঠিকানা হয়ে ওঠেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।’ (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)
যে পরিবারে ভালোবাসা, ক্ষমাশীলতা ও দয়া বিদ্যমান থাকে, সে পরিবারই প্রকৃত সুখের ঠিকানা হয়ে ওঠে।
৪. স্বামীর দায়িত্বশীল নেতৃত্ব
ইসলাম পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব স্বামীর ওপর অর্পণ করেছে। তবে এই নেতৃত্ব কোনো আধিপত্য বা কঠোরতার প্রতীক নয়; বরং এটি দায়িত্ব, সুরক্ষা, ভরণপোষণ এবং পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
‘পুরুষরা নারীদের অভিভাবক; কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর কিছু বৈশিষ্ট্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের স্ত্রীদের প্রতি সদয় আচরণ, যথাযথ ভরণপোষণ এবং সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।
৫. উত্তম চরিত্র ও সদাচরণ
সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রাণ হলো উত্তম চরিত্র। ভালোবাসা কেবল মুখের কথায় নয়; তা প্রকাশ পায় ব্যবহার, সহানুভূতি, ক্ষমাশীলতা এবং ছোট ছোট যত্নের মাধ্যমে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫, ইবনে মাজাহ ১৯৭৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে ঘরের কাজে সহযোগিতা করতেন, স্ত্রীদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল আচরণ করতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতেন। তার জীবনই আদর্শ দাম্পত্যের সর্বোত্তম উদাহরণ।
সুখী সংসার কেবল অর্থ-বিত্ত, বিলাসিতা বা বাহ্যিক আভিজাত্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং এর প্রকৃত ভিত্তি হলো ইমান, তাকওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা। স্বামী-স্ত্রী যখন আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরস্পরের অধিকার আদায় করেন, তখন সেই পরিবারে নেমে আসে শান্তি (সাকীনাহ), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও রহমত (রাহমাহ)।
মনে রাখা উচিত, পৃথিবীতে কোনো মানুষই নিখুঁত নয়। তাই দোষ খোঁজার পরিবর্তে একে অপরকে বুঝতে শেখা, ক্ষমা করতে শেখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পর্ককে লালন করাই একটি জান্নাতসম সংসার গড়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আদর্শ, শান্তিময় ও বরকতময় পরিবার গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

