হাঁটার অভ্যাসই যখন বান্দার গুনাহ মাফের উপায়
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
দুনিয়া ও আখিরাত—দুই জগতের কল্যাণ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনের জন্য হাঁটার বিকল্প নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার পরামর্শ দেয়—এটি হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখে, মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরকে সতেজ রাখে। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য হাঁটার গুরুত্ব শুধু শারীরিক উপকারেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই ইবাদত, যা গুনাহ মাফের কারণ, মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম এবং জান্নাতের পথে অগ্রযাত্রার এক মহামূল্যবান সুযোগ। যে হাঁটা মানুষকে সুস্থ রাখে, সেই হাঁটাই তাকে আখিরাতেও সফল করতে পারে।
মসজিদের পথে হাঁটা—ইবাদত, ইমান ও আত্মশুদ্ধির পথ
আজ আমরা শরীরচর্চার জন্য পার্ক, ট্র্যাক কিংবা জিমে হাঁটি। অথচ প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই শিখিয়েছেন— আল্লাহর ঘরের দিকে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও পরিশুদ্ধ করে।
বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাজের জন্য ঘুমের আরাম ত্যাগ করে মসজিদের দিকে হাঁটা একজন মুমিনের আন্তরিকতা ও ইমানের উজ্জ্বল নিদর্শন। যখন একজন মুসল্লি ওজু করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদের পথে বের হন, তখন প্রতিটি কদমের সঙ্গে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি করে গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
‘আল্লাহর মসজিদসমূহ তো কেবল তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ইমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা আত-তওবাহ: আয়াত ১৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
‘আর নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য; অতএব আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে আহ্বান কর না।’ (সুরা আল-জিন: আয়াত ১৮)
হাদিসের আলোকে মসজিদে হাঁটার মর্যাদা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللَّهُ بِهِ الْخَطَايَا وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ ... إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ
‘আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? ... তা হলো—কষ্টের সময়ও সুন্দরভাবে ওজু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি পদচারণা করা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় থাকা। এটাই (সওয়াবের দিক থেকে) রিবাত।’ (মুসলিম ২৫১)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَنْ تَطَهَّرَ فِي بَيْتِهِ، ثُمَّ مَشَى إِلَى بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ لِيَقْضِيَ فَرِيضَةً مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ، كَانَتْ خَطْوَتَاهُ إِحْدَاهُمَا تَحُطُّ خَطِيئَةً، وَالْأُخْرَى تَرْفَعُ دَرَجَةً
‘যে ব্যক্তি নিজ ঘরে ওজু করে আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো এক ঘরের দিকে ফরজ সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যায়, তার প্রতিটি দুই পদক্ষেপের একটির মাধ্যমে একটি গুনাহ মুছে দেওয়া হয় এবং অন্যটির মাধ্যমে একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।’ (মুসলিম ৬৬৬)
দুনিয়া ও আখিরাত—দুই জগতের কল্যাণ
মসজিদের পথে হাঁটার এই সুন্নতের মধ্যে রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতের কল্যাণ। নিয়মিত হাঁটা শরীরকে সুস্থ রাখে, হৃদ্রোগ, স্থূলতা ও মানসিক অবসাদের ঝুঁকি কমায়। একই সঙ্গে এটি মানুষকে অলসতা থেকে মুক্ত করে, সময়ানুবর্তী করে এবং আল্লাহর স্মরণে হৃদয়কে প্রশান্ত রাখে।
সবচেয়ে বড় কথা, মসজিদের দিকে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ এমন একটি বিনিয়োগ, যার প্রতিদান শুধু পৃথিবীতে নয়, আখিরাতেও লাভ করা যাবে।
আজ আমরা সুস্থ থাকার জন্য বিভিন্ন উপায় খুঁজি, অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.) এমন একটি পথ দেখিয়ে গেছেন, যা একই সঙ্গে শরীর, মন ও আত্মাকে সুস্থ রাখে। মসজিদের পথে হাঁটা কেবল একটি দৈনন্দিন অভ্যাস নয়; মসজিদের পথে হাঁটার প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতিটি মানুষের পাপমোচন, মর্যাদা বৃদ্ধি ও জান্নাতের পথে এক অনন্য যাত্রা।
আসুন, অযথা যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে—বিশেষ করে ফজর, মাগরিব ও এশার নামাজে—সুযোগ থাকলে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি। হয়তো আমাদের অগণিত পদচিহ্নই কিয়ামতের দিন আল্লাহর রহমত লাভের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর ঘরের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং মসজিদের পথে নিয়মিত পদচারণার তৌফিক দান করুন। আমিন।

