Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

যে ১০ শর্তে কবুল হয় তওবা, খুলে যায় আল্লাহর ক্ষমা লাভের পথ

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

যে ১০ শর্তে কবুল হয় তওবা, খুলে যায় আল্লাহর ক্ষমা লাভের পথ

তওবা কবুল হওয়ার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনের কোনো না কোনো সময় সে গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দার জন্য তওবার দরজা কখনো বন্ধ করে দেননি। বান্দা যদি নিজের ভুল উপলব্ধি করে আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে রবের দরবারে ফিরে আসে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করেন।

তওবা কেবল মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ উচ্চারণের নাম নয়। প্রকৃত তওবা হলো গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত হওয়া, অতীতের জন্য অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করা। কুরআন ও সহিহ হাদিসে তওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও করণীয় উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মুমিনের জন্য এগুলো জানা এবং বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ

‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তার দিকেই প্রত্যাবর্তন (তওবা) কর।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৩)

তওবা কবুল হওয়ার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

১. সঙ্গে সঙ্গে গুনাহ থেকে বিরত হওয়া

তওবার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, যে গুনাহের জন্য তওবা করা হচ্ছে তা অবিলম্বে পরিত্যাগ করা। গুনাহ করতে করতে প্রকৃত তওবা হয় না। তাই আন্তরিক তওবার জন্য প্রথমেই পাপের পথ থেকে সরে আসতে হবে।

২. আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া

তওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার বিষয় নয়; বরং অন্তরের গভীর অনুশোচনার নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

النَّدَمُ تَوْبَةٌ

‘অনুতপ্ত হওয়াই হলো তওবা।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫২)

অতএব, নিজের গুনাহের জন্য অন্তর থেকে লজ্জিত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাই প্রকৃত তওবার ভিত্তি।

৩. ভবিষ্যতে সেই গুনাহে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা

তওবার অন্যতম শর্ত হলো, ভবিষ্যতে সেই গুনাহে আর ফিরে না যাওয়ার আন্তরিক অঙ্গীকার করা। মানুষ দুর্বলতার কারণে পরবর্তীতে আবার ভুল করতে পারে। কিন্তু তওবার মুহূর্তে তার দৃঢ় নিয়ত থাকতে হবে— সে ইচ্ছাকৃতভাবে আর সেই গুনাহে ফিরবে না।

৪. মানুষের হক আদায় করা

যদি গুনাহ অন্য কোনো মানুষের অধিকার বা সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই যথেষ্ট নয়। যার হক নষ্ট হয়েছে, তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। কারণ বান্দার হক আদায় ছাড়া সেই অন্যায়ের পূর্ণ সংশোধন হয় না।

৫. তওবা হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ, শাস্তির ভয় কিংবা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া প্রকৃত তওবা নয়। সত্যিকারের তওবার উদ্দেশ্য হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার নৈকট্য লাভ।

৬. গুনাহের পরিবেশ ও খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করা

অনেক সময় খারাপ বন্ধু কিংবা অসুস্থ পরিবেশ মানুষকে বারবার গুনাহের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন—

الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍۢ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ

‘সেদিন বন্ধুরাই একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা আয-যুখরুফ: আয়াত ৬৭)

তাই তওবার পর সৎ মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ এবং গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৭. গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকা

যেসব বস্তু, মাধ্যম বা পরিস্থিতি মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলোও পরিহার করা উচিত। কারণ গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকলে তওবার ওপর অটল থাকা সহজ হয়।

৮. তওবার পর দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা

গুনাহের পর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا مِنْ رَجُلٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا، ثُمَّ يَقُومُ فَيَتَطَهَّرُ، ثُمَّ يُصَلِّي، ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ، إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهُ

‘কোনো ব্যক্তি গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (আবু দাউদ ১৫২১, তিরমিজি ৪০৬)

৯. তওবার পর নেক আমল বৃদ্ধি করা

তওবার পর বেশি বেশি নেক আমল করা উচিত। কারণ নেক আমল মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করে এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ

‘তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেবেন।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭০)

১০. সময় থাকতে তওবা করা

তওবা করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ

‘বান্দার প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছার (মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার) আগে পর্যন্ত আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫৩, তিরমিজি ৩৫৩৭)

তাই মৃত্যু আসার আগেই এবং কিয়ামতের বড় আলামত হিসেবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগেই তওবা করে নেওয়া উচিত।

কখনো নিরাশ হবেন না

তওবার পর যদি দুর্বলতার কারণে আবার কোনো ভুল হয়ে যায়, তাহলে হতাশ হওয়া যাবে না। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আবারও আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)

তাই কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া একজন মুমিনের জন্য উচিত নয়।

তওবা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক অনন্য রহমত। এটি শুধু অতীতের গুনাহ মুছে দেওয়ার পথ নয়; বরং নতুন করে আল্লাহর পথে ফিরে আসার এক মহিমান্বিত সুযোগ। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে, গুনাহ থেকে ফিরে আসে, মানুষের হক আদায় করে এবং নেক আমলের মাধ্যমে জীবন সাজাতে চেষ্টা করে—আল্লাহ তাআলা তার জন্য ক্ষমা, রহমত ও সফলতার দরজা খুলে দেন।

তাই তওবাকে আগামীকালের জন্য ফেলে না রেখে আজই আল্লাহর দরবারে ফিরে আসা উচিত। কারণ আমরা জানি না, আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত কখন এসে যাবে। আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা আছে— প্রয়োজন শুধু একটি অনুতপ্ত হৃদয় এবং আন্তরিক প্রত্যাবর্তন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিক তাওবা করার তৌফিক দান করুন, আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করুন এবং তার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম