Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

অফিসের দায়িত্ব পালনও যখন ইবাদত

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

অফিসের দায়িত্ব পালনও যখন ইবাদত

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলাম কেবল মসজিদ, নামাজ বা নির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো জীবনব্যবস্থা নয়; বরং মানুষের পুরো জীবনকে আল্লাহমুখী করে তোলাই ইসলামের শিক্ষা। একজন মুমিনের প্রতিটি বৈধ কাজ— যদি তা বিশুদ্ধ নিয়তে, হালাল উপায়ে এবং শরিয়তের বিধান মেনে সম্পাদিত হয়— তবে সেটিও ইবাদতে পরিণত হয়। তাই একজন চাকরিজীবীর অফিসের দায়িত্ব, সময়ানুবর্তিতা, সততা, আমানতদারি এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কর্মজীবনকে কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়, বরং ইবাদতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন সচেতন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু— সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৬২)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়, মুমিনের জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত হওয়া উচিত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অফিসের দায়িত্বও ইবাদতের পরিধির অন্তর্ভুক্ত।

১. নিয়তের বিশুদ্ধতা: ইবাদতের মূল ভিত্তি

কর্মক্ষেত্রে দৈনন্দিন দায়িত্বকে ইবাদতে রূপান্তর করার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। একজন কর্মচারী যখন নিজের, পরিবারের হালাল জীবিকা নিশ্চিত করা, সমাজের উপকার সাধন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তখন তার সেই শ্রমও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى

‘সমস্ত কাজের মূল্যায়ন নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক মানুষ তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি ১, মুসলিম ১৯০৭)

অতএব, একই কাজ বিশুদ্ধ নিয়তের কারণে ইবাদতে পরিণত হতে পারে, আবার নিয়তের ত্রুটিতে তা সওয়াবহীনও হতে পারে।

২. দায়িত্ব একটি পবিত্র আমানত

ইসলামের দৃষ্টিতে চাকরি, পদ-পদবি কিংবা দায়িত্ব কোনো বিশেষ মর্যাদার প্রতীক নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণের মাধ্যমে একজন কর্মচারী তার সময়, শ্রম, দক্ষতা ও সততার একটি অঙ্গীকার করেন। সেই অঙ্গীকার পূরণ করা ইসলামের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সব চুক্তি পূর্ণ কর।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ১)

আরও ইরশাদ হয়েছে—

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দাও।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৫৮)

অতএব, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা কর্তব্যে গাফিলতি শুধু প্রশাসনিক অপরাধ নয়; ইসলামের দৃষ্টিতেও তা আমানতের খেয়ানত।

৩. সময় ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা: ঈমানদারের দায়িত্ব

চাকরিজীবীর জন্য নির্ধারিত কর্মঘণ্টা প্রতিষ্ঠানের একটি আমানত। সময়মতো অফিসে উপস্থিত না হওয়া, দায়িত্ব পালন না করে আড্ডা দেওয়া, অযথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করা অথবা ব্যক্তিগত কাজে অফিসের সময় ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানতের শামিল। একইভাবে অফিসের কাগজ, যানবাহন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট বা অন্যান্য সম্পদ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অপব্যবহার করাও বৈধ নয়। কারণ মুসলমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আমানত রক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ

‘যে আমানত রক্ষা করে না, তার ইমান পূর্ণ নয়; আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন পূর্ণ নয়।’ (মুসনাদ আহমাদ ১২৫৬৭)

৪. দুর্নীতি, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা

কর্মজীবনকে ইবাদতে রূপ দেওয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফাইল অযথা আটকে রাখা, সেবা প্রদানে বিলম্ব করা, দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে অর্থ বা বিশেষ সুবিধা দাবি করা কিংবা পদমর্যাদাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিজি ১৩৩৭)

আর কুরআনে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার ব্যাপারে সতর্ক করে বলা হয়েছে—

وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ

‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কর না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৮)

অতএব, সততা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই একজন মুমিন কর্মচারীর পরিচয়।

একজন মুমিনের কাছে অফিস কেবল উপার্জনের স্থান নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশুদ্ধ নিয়ত, সময়ানুবর্তিতা, আমানতদারি, দায়িত্বশীলতা, সততা এবং দুর্নীতিমুক্ত কর্মজীবন একজন মুসলমানকে যেমন মানুষের কাছে সম্মানিত করে, তেমনি আল্লাহর কাছেও মর্যাদাবান করে তোলে। যখন একজন কর্মচারী প্রতিটি দায়িত্বকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করেন, তখন তার কর্মঘণ্টা, পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও সততা—সবই ইবাদতে পরিণত হয়। তাই কর্মস্থলকে ইবাদতের ময়দান হিসেবে গড়ে তোলা এবং প্রতিটি দায়িত্বকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে সম্পন্ন করাই একজন প্রকৃত মুমিনের আদর্শ হওয়া উচিত।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম