মৃত ব্যক্তিরা কি জীবিতদের কথা শুনতে ও দেখতে পায়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত্যুর মাধ্যমে একজন মানুষ ইহকালীন জগত থেকে বিদায় নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে—‘আলমে বারজাখ’ বা কবরের জীবনে পদার্পণ করে। মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তি কি কবরে বসে জীবিতদের কথা শুনতে পায় কিংবা তাদের দেখতে পায়? এ বিষয়টি ইসলামী আকিদা ও ফিকহের এক গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম আলোচনার অংশ।
সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই এ বিষয়ে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং নির্ভরযোগ্য ফুকাহায়ে কেরামের মাঝেও এই মতপার্থক্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও আলেমের (জমহুর উলামা) মতে, মৃত ব্যক্তি স্বাভাবিক সাধারণ নিয়মে দুনিয়ার সব কথা শুনতে বা দেখতে না পেলেও কবরের পাশে এসে সালাম দেওয়া ও কথা বলা ব্যক্তি সম্পর্কে তারা অবগত হতে পারে।
মৃতদের শোনা ও দেখার বিষয়ে সাহাবা ও উলামাদের মতামত
১. জমহুর (অধিকাংশ) আলেম ও হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর মত
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে, কবরবাসী জীবিতদের কথা— বিশেষ করে যারা কবরের পাশে গিয়ে সালাম ও দোয়া করে—তাদের কথা শুনতে পায় এবং তাদেরকে চিনতে পারে।
দফন শেষে ফিরে যাওয়ার শব্দ শোনা
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেছেন—
العَبْدُ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ، وَتُوُلِّيَ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ، وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ
‘বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথীরা তাকে রেখে চলে যেতে থাকে, তখন সে নিশ্চিতভাবেই তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়।’ (বুখারি ১৩৭৪, মুসলিম ২৮৭০)
বদর প্রান্তরে নিহতদের সম্বোধন
বদরের যুদ্ধে নিহত মুশরিকদের লাশ যখন গর্তে নিক্ষেপ করা হয়, তখন রাসুল (সা.) তাদের নাম ধরে ডেকেছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তখন প্রশ্ন করলে রাসুল (সা.) উত্তর দেন—
فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا تُكَلِّمُ مِنْ أَجْسَادٍ لاَ أَرْوَاحَ لَهَا؟ فَقَالَ: «مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ، غَيْرَ أَنَّهُمْ لاَ يَسْتَطِيعُونَ أَنْ يَرُدُّوا عَلَيَّ»
‘ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি এমন মরদেহের সঙ্গে কথা বলছেন যাদের কোনো রুহ নেই? রাসুল (সা.) বললেন, আমি যা বলছি তা শোনার ক্ষেত্রে তোমরা তাদের চেয়ে বেশি শুনতে পাও না; তবে পার্থক্য হলো তারা আমার কোনো উত্তর দিতে পারে না।’ (বুখারি ১৩৭০, মুসলিম ২৮৭৩)
সালাম দেওয়া ও চেনার হাদিস
কবর জিয়ারতের সময় স্বজনদের সালাম ও আগমনের বিষয়ে হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
مَا مِنْ رَجُلٍ يَمُرُّ بِقَبْرِ أَخِيهِ كَانَ يَعْرِفُهُ فِي الدُّنْيَا، فَيُسَلِّمُ عَلَيْهِ، إِلَّا عَرَفَهُ وَرَدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ
‘যে কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে তার পরিচিত কোনো ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে যায় এবং তাকে সালাম দেয়, তবে মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারে এবং তার সালামের উত্তর দেয়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির ৩/৪৩৯; ইবনুল কাইয়্যিম, কিতাবুর রুহ পৃষ্ঠা ৯)
২. উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর মত
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)সহ কিছু সাহাবি ও আলেমের মতে, মৃত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক নিয়মে জীবিতদের কথা শুনতে বা দেখতে পায় না। তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করতেন—
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَىٰ
‘নিশ্চয়ই আপনি মৃতদের কথা শুনাতে পারবেন না।’ (সুরা আন-নামল: আয়াত ৮০ ও সুরা আর-রূম: আয়াত ৫২)
অন্য আয়াতে এসেছে—
وَمَا أَنتَ بِمُسْمِعٍ مَّن فِي الْقُبُورِ
‘আর আপনি কবরে থাকা ব্যক্তিদের কথা শুনাতে পারবেন না।’ (সুরা ফাতির: আয়াত ২২)
হজরত আয়েশা (রা.) মনে করতেন, বদরের ঘটনাটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিশেষ মোজেজা এবং কাফেরদের ধমক ও আফসোসের অংশ হিসেবে আল্লাহ তাআলা সাময়িকভাবে তাদের শুনার শক্তি দান করেছিলেন।
৩. মধ্যমপন্থী ও সমন্বিত মত (আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিমের বিশ্লেষণ)
প্রখ্যাত মুফাসসির ও ফকিহগণ উভয় দিকের দলিলের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় করেছেন—
‘স্বাভাবিক অবস্থায় মৃতদের নিজস্ব কোনো শোনার বা দেখার ক্ষমতা নেই: মানুষ মারা গেলে তার পার্থিব ইন্দ্রিয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কুরআনের আয়াতের অর্থ হলো— জীবিতরা চাইলেই মৃতদের কিছু শোনাতে পারে না।
তবে আল্লাহ তাআলা যখন চান এবং কবরের পাশে যখন কেউ যায়: মৃত ব্যক্তির নিজস্ব কোনো ক্ষমতা না থাকলেও মহান আল্লাহ তাআলা যখন ইচ্ছা করেন তখন তাদেরকে শুনান। কবরের পাশে গিয়ে সালাম দিলে, কথা বললে বা দোয়া করলে আল্লাহ তাদের তা শুনার ও জানার ব্যবস্থা করে দেন।
দূর থেকে শুনতে পায় না: মৃত ব্যক্তি কবরে বসে দুনিয়ার দূর-দূরান্তের সব কথা শুনছে বা সবকিছু দেখছে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তবে কবরের নিকটবর্তী ব্যক্তির উপস্থিতি ও সালাম আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অবগত করান।
সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, বারজাখের জীবন পার্থিব জীবনের মতো নয়; এটি গায়েব বা অদৃশ্য জগতের বিষয়। মৃত ব্যক্তিরা নিজস্ব ক্ষমতায় সবকিছু দেখতে বা শুনতে পায় না, তবে কবরের পাশে গিয়ে সালাম ও দোয়া করলে আল্লাহ তাআলার কুদরতে তারা তা উপলব্ধি করতে পারে।
এ কারণেই কবর জিয়ারতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি সম্বোধন করে সালাম দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন—
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ: ‘আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারে মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা।’
অর্থ: ‘হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসী! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ (মুসলিম ৯৭৫)
অতএব, মৃত স্বজনদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, দোয়া-দরুদ পড়া, সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা এবং তাদের কবর জিয়ারত করে সালাম জানানো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকল প্রয়াত মুমিন ভাই-বোনদের ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

