বরকতময় সহজ ৫ সুন্নত আমল, পালনে প্রয়োজন হয় না বাড়তি সময়
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুন্নত মানেই যে সবসময় অনেক বড় বা দীর্ঘ সময়ের কোনো আমল হতে হবে—এমন নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনধারা আমাদের দৈনন্দিন অতি সাধারণ কাজের মধ্যেও লুকিয়ে রেখেছে অসীম সওয়াব ও বরকতের সুযোগ। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে নববী সুন্নতের সুবাস।
এসব সুন্নত পালনের জন্য আলাদা কোনো সময় কিংবা অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কেবল আন্তরিক ইচ্ছা ও সামান্য সচেতনতা। অথচ আমাদের অসচেতনতা ও অবহেলার কারণে প্রতিদিন আমরা এমন বহু সহজ আমল হাতছাড়া করে ফেলি। দৈনন্দিন জীবনের এমনই ৫টি অত্যন্ত সহজ কিন্তু অপরিসীম ফজিলতপূর্ণ সুন্নত এবং তার বিধান নিচে তুলে ধরা হলো।
দৈনন্দিন জীবনের সহজ ৫টি সুন্নত
১. পানাহারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা
খাবার ও পানীয় গ্রহণের শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। এর মাধ্যমে খাবারে আল্লাহর বরকত অবতীর্ণ হয় এবং শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى، فَإِنْ نَسِيَ أَنْ يَذْكُرَ اسْمَ اللَّهِ تَعَالَى فِي أَوَّلِهِ فَلْيَقُلْ: بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ
‘তোমাদের কেউ যখন আহার শুরু করে, সে যেন আল্লাহর নাম স্মরণ করে (অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে)। তবে যদি শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যায়, তবে সে যেন বলে—‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (আল্লাহর নাম নিয়ে এর শুরু এবং শেষ করছি)।’ (আবু দাউদ ৩৭৬৭, তিরমিজি ১৮৫৮)
২. হাসিমুখে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা
কারও সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলা শুধু সৌজন্যবোধই নয়, বরং এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ইবাদত। মুচকি হাসির মাধ্যমে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায় এবং এটি দান-সদকার সমতুল্য পুণ্য বয়ে আনে। হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
‘তোমার ভাইয়ের (মুমিনের) মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার মুচকি হাসাও তোমার জন্য একটি সদকা।’ (তিরমিজি ১৯৫৬)
৩. বসে এবং ধীরে ধীরে দুই-তিন শ্বাসে পানি পান করা
দাঁড়িয়ে বা এক ঢোকে দ্রুত পানি পান না করে বসে শান্তভাবে দুই বা তিন শ্বাসে পানি পান করা সুন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لاَ تَشْرَبُوا وَاحِدًا كَشُرْبِ الْبَعِيرِ، وَلَكِنِ اشْرَبُوا مَثْنَى وَثُلاَثَ
‘তোমরা উটের মতো এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পানি পান করো না; বরং দুই বা তিন শ্বাসে পান কর।’ (তিরমিজি ১৮৮৫)
৪. জুতা ও পোশাক পরিধানে ডান দিক দিয়ে শুরু করা
যেকোনো ভালো, পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ কাজে ডান দিক প্রাধান্য দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম সুন্দর একটি বৈশিষ্ট্য। পোশাক বা জুতা পরার সময় ডান দিক দিয়ে শুরু করা এবং খোলার সময় বাম দিক থেকে খোলা সুন্নত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِذَا انْتَعَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأْ بِاليَمِينِ، وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدَأْ بِالشِّمَالِ، لِيَكُنِ اليُمْنَى أَوَّلَهُمَا تُنْعَلُ وَآخِرَهُمَا تُنْزَعُ
‘তোমাদের কেউ যখন জুতা পরিধান করে, সে যেন ডান পা দিয়ে শুরু করে; আর যখন খোলে, তখন যেন বাম পা দিয়ে শুরু করে। যাতে ডান পা পরিধানে প্রথম এবং খোলার সময় শেষ হয়।’ (বুখারি ৫৮৫৫)
৫. শোয়ার পূর্বে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া, অজু করা ও ডান কাতে শোয়া
ঘুমানো কেবল দৈহিক বিশ্রাম নয়, বরং সুন্নতি নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে পুরো ঘুমের সময়টিকেই ইবাদতে রূপান্তর করা সম্ভব। হজরত বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ، فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلاَةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقِّكَ الأَيْمَنِ
‘যখন তুমি বিছানায় ঘুমাতে যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করবে; অতঃপর ডান কাতে শয়ন করবে।’ (বুখারি: ২৪৭)
বিছানা ঝেড়ে নেওয়ার বিষয়ে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন—
إِذَا أَوَى أَحَدُكُمْ إِلَى فِرَاشِهِ فَلْيَنْفُضْ فِرَاشَهُ بِدَاخِلَةِ إِزَارِهِ، فَإِنَّهُ لاَ يَدْرِي مَا خَلَفَهُ عَلَيْهِ
‘তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যায়, সে যেন তার চাদর বা কাপড়ের ভেতরের অংশ দিয়ে বিছানাটি ঝেড়ে নেয়। কারণ সে জানে না যে, তার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কী (কীটপতঙ্গ বা ক্ষতিকর জিনিস) প্রবেশ করেছে।’ (বুখারি ৬৩২০)
সুন্নত অনুসরণে কুরআনের গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য ও তার সুন্নতের অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমার নিশ্চয়তা। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
‘(হে রাসুল!) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে অনুসরণ কর; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৩১)
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণের নিয়তে বদলে যেতে পারে মহান ইবাদতে। খাবার খাওয়া, পানি পান করা, পোশাক পরা কিংবা ঘুমাতে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক কাজগুলো যখন সুন্নতের রঙে রঙিন হবে, তখন জীবন বরকতময় হয়ে উঠবে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ সহজ হবে। তাই আসুন, অবহেলা পরিহার করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নববী সুন্নতের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর ওপর পরিপূর্ণ আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

