Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

যেসব কাজে সংসারে শান্তি ও ঘরের বরকত কমে যায়

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম

যেসব কাজে সংসারে শান্তি ও ঘরের বরকত কমে যায়

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘বরকত’ মানে শুধুই বিপুল অর্থ-সম্পদ বা প্রাচুর্য নয়। বরকত হলো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমন এক ঐশী কল্যাণ ও প্রাচুর্য, যা অল্প উপার্জনেও সংসারের অভাব মিটিয়ে দেয়, অন্তরে তৃপ্তি এনে দেয় এবং পরিবারে ছড়িয়ে দেয় অনাবিল শান্তি, সুস্থতা ও ভালোবাসা।

আজকের সমাজে অনেকেরই আয়-রোজগার প্রচুর, কিন্তু সংসারে স্বস্তি নেই; নিত্যদিনের কলহ, অসুস্থতা ও মানসিক অশান্তিতে জীবন বিষাদময়। ইসলাম আমাদের শেখায়— পারিবারিক সুখ-শান্তি এবং বরকতের বিষয়টি মানুষের ইমান, আমল, উপার্জন ও দৈনন্দিন আচরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৈনন্দিন জীবনের অসচেতনতা এবং কিছু ভুলের কারণে আমাদের ঘর থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত বরকত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিম্নে সংসারের শান্তি ও ঘরের বরকত কমে যাওয়ার ৯টি প্রধান কারণ এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ঘরের বরকত নষ্ট হওয়ার ৯টি প্রধান কারণ

১. ঘরে আল্লাহর জিকির ও ইবাদতের পরিবেশ না থাকা

যে ঘর নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকির থেকে শূন্য, সে ঘরে বরকত থাকে না। জিকিরহীন ঘরকে হাদিসে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الحَيِّ وَالمَيِّتِ

‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের জিকির করে আর যে ব্যক্তি জিকির করে না, তাদের উদাহরণ হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।’ (বুখারি ৬৪০৭)

২. হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জনের প্রবেশ

সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা কিংবা অন্যায্য উপায়ে উপার্জিত অর্থ সংসারে প্রবেশ করলে বাহ্যিক প্রাচুর্য বাড়লেও অভ্যন্তরীণ বরকত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র ব্যতীত কোনো কিছু কবুল করেন না। হাদিসে পাকে এসেছে—

إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ১০১৫)

৩. পাপাচার ও আল্লাহর অবাধ্যতা

পাপের কারণে আসমান ও জমিনের বরকত বন্ধ হয়ে যায়। ইমান ও তাকওয়াই হলো রহমতের দুয়ার খোলার মূল চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ

‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ৯৬)

৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা

পারিবারিক ক্ষোভ, অহংকার বা বিরোধের কারণে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বরকত কমার অন্যতম বড় কারণ। হাদিসে পাকে এসেছে—

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ

‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি ৫৯৮৬)

৫. আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা (না-শুকরি)

আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত— পরিবার, স্বাস্থ্য ও রিজিকে সন্তুষ্ট না থেকে সবসময় অপ্রাপ্তির অভিযোগ করতে থাকলে নিয়ামত হ্রাস পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَئِن شَكَرْتُمْ لأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অতি কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৭)

৬. ব্যবসা ও লেনদেনে মিথ্যা ও প্রতারণা

কেনাবেচা বা কর্মক্ষেত্রে মিথ্যা বলা, পণ্যের ত্রুটি লুকানো বা ধোঁকা দিলে উপার্জনের বরকত বিদায় নেয়। হাদিসে পাকে এসেছে—

فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُورِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا، وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا

‘ক্রেতা-বিক্রেতা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের দোষ-ত্রুটি স্পষ্ট করে, তবে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং ত্রুটি গোপন করে, তবে তাদের বেচাকেনার বরকত নষ্ট করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ২০৭৯)

৭. অপচয় ও বেহিসাবি খরচ

সামর্থ্য ও প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত খরচ এবং অপচয়ের অভ্যাস সংসারের সমৃদ্ধি কেড়ে নেয়। কুরআনের বাণী—

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلاَ تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

‘আর খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ৩১)

৮. ঘরে প্রবেশের সময় সালাম না দেওয়া

ঘরে প্রবেশের সময় সালাম না দেওয়া শয়তানকে ঘরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। অথচ ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া বরকত ও শান্তির কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً

‘অতঃপর যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা নিজেদের লোকদের সালাম করবে; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ 

(সুরা আন-নূর: আয়াত ৬১)

৯. খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ না বলা ও একা খাওয়া

খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ না করলে খাবারে শয়তানের অংশীদারিত্ব ঘটে এবং বরকত চলে যায়। হাদিসে পাকে এসেছে—

إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ، فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ، قَالَ الشَّيْطَانُ: لَا مَبِيتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ

‘যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশকালে এবং খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে— ‘আজ রাতে তোমাদের এখানে থাকারও কোনো জায়গা নেই এবং রাতের খাবারেরও কোনো সুযোগ নেই।’ (মুসলিম ২০১৮)

উল্লেখ্য পরিবারের সকলে মিলে একত্রে খাবার গ্রহণ করাও বরকত বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। (আবু দাউদ ৩৭৬৪)

ঘরের বরকত বৃদ্ধি ও ধরে রাখার কার্যকর আমল

১. অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করা

ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বৃষ্টিবর্ষণ, ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত দান করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ

‘অতঃপর বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন।’ (সুরা নুহ: আয়াত ১০-১২)

২. ভোরের বরকত গ্রহণ করা

ফজরের পর আলসেমিতে সময় নষ্ট না করে দিনের শুরুটা জিকির, তিলাওয়াত ও হালাল উপার্জনের মাধ্যমে শুরু করা। হাদিসে পাকে এসেছে—

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا

‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে তার সকালের কাজে বরকত দান করুন।’ (আবু দাউদ ২৬০৬)

৩. দান-সদকা ও হালাল রিজিকের নিশ্চয়তা

গোপনে ও প্রকাশ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা এবং আয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ সততা ও হালাল পন্থা বজায় রাখা।

বরকত হলো আল্লাহ তাআলার বিশেষ এক অনুগ্রহ, যা দুনিয়ার কোনো পার্থিব হিসাব-নিকাশ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অল্প টাকায় পরিবারের স্বচ্ছলতা, কঠিন বিপদে আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য, সুস্থ শরীর এবং মনের গভীর প্রশান্তিই হলো বরকতের আসল বহিঃপ্রকাশ।

আসুন, আমরা আমাদের ঘরগুলোকে পাপ ও পাপাচারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে নামাজ, তিলাওয়াত, সালাম ও পারস্পরিক ভালোবাসায় উজ্জ্বল করি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকল পরিবারকে যাবতীয় অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে রহমত, শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

দরুদ শরিফ পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

খাঁটি তওবার সঠিক নিয়ম ও ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

খাঁটি তওবার সঠিক নিয়ম ও ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কি সঠিক?

‘মুহাম্মদ’ নাম রাখার ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলো কি সঠিক?

ঘরে ঢুকেই সালাম দিলে মিলবে যেসব বকরত ও ফজিলত

ঘরে ঢুকেই সালাম দিলে মিলবে যেসব বকরত ও ফজিলত

অর্থকষ্টে পড়লে যেসব আমল করবেন

অর্থকষ্টে পড়লে যেসব আমল করবেন

আরও পড়ুন

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, মুসলিম আইন কী বলে?

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

নারীরা কি জিন্স বা টাইট প্যান্ট পরতে পারবে? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

মেসেজে তালাক দিলে কার্যকর হবে?

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৫ নভেম্বর ২০২৬

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম