Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

কুরআনের যে ৪ মূলনীতি বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

কুরআনের যে ৪ মূলনীতি বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র কুরআন কেবল কোনো সাধারণ পাঠ্যগ্রন্থ নয়; বরং এটি মানবজীবনের সামগ্রিক পথপ্রদর্শক ও আত্মিক চিকিৎসার আলোকবর্তিকা। দৈনন্দিন ব্যস্ততা, হতাশা ও লক্ষ্যহীনতার ভিড়ে মানুষ যখন পথ হারায়, তখন মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট বাণী মানুষকে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। কুরআনে বর্ণিত এমন চারটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে— প্রতিদান, জবাবদিহিতা, তাওবা এবং রিজিক—যা গভীরভাবে উপলব্ধি করলে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও জীবনের গতিপথ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

১. সৎকাজের বহুগুণ প্রতিদান: সামান্য আমলেও অফুরন্ত লাভ

আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি পরম দয়ালু। মানুষ যখন আন্তরিকতার সঙ্গে কোনো নেক কাজ করে, আল্লাহ তার প্রতিদান কেবল একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

‘যে ব্যক্তি একটি সৎকর্ম নিয়ে আসবে, তার জন্য রয়েছে তার দশগুণ প্রতিদান। আর যে ব্যক্তি একটি মন্দ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে কেবল তার সমপরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে এবং তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আল-আন‘আম: আয়াত ১৬০)

হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ، الْحَسَنَةُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ

‘আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।’ (মুসলিম ১১৫১)

২. জীবনের উদ্দেশ্য ও জবাবদিহিতা: মানুষ অনর্থক সৃষ্টি নয়

মানুষের সৃষ্টি কোনো উদ্দেশ্যহীন ঘটনা নয়। এই ধরাতলে প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস এবং কর্মকাণ্ডের একটি হিসাব রয়েছে। মানুষ যদি মনে করে সে যা খুশি তা-ই করে দায়মুক্তি পাবে, তবে তা চূড়ান্ত বিভ্রান্তি। কুরআনের ভাষায়—

أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَن يُتْرَكَ سُدًى

‘মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনিই (উদ্দেশ্যহীন ও দায়মুক্তভাবে) ছেড়ে দেওয়া হবে?’ (সুরা আল-কিয়ামাহ: আয়াত ৩৬)

হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ

‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা একচুলও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে—তার বয়স সে কোথায় ব্যয় করেছে, তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কী আমল করেছে, তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় খরচ করেছে এবং তার শরীরকে কিসে ক্ষয় করেছে।’ (তিরমিজি ২৪১৭)

৩. ত্বরিত তওবার গুরুত্ব: ভুলের পর অবিলম্বে প্রত্যাবর্তন

মানুষ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তবে প্রকৃত মুমিন সেই, যে পাপ করার পর গাফলতি না করে অবিলম্বে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয় এবং নিজের ভুল শুধরে নেয়।

কুরআনের আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا

‘আল্লাহ তো তাদেরই তওবা কবুল করেন, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে। আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে পাকে ইরশাদ করেন—

كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ

‘প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী বা অপরাধী; আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা তওবা করে (আল্লাহর দিকে ফিরে আসে)।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫১, তিরমিজি ২৪৯৯)

৪. একমাত্র রিজিকদাতা আল্লাহ: অহেতুক দুশ্চিন্তার অবসান

রিজিকের চাবিকাঠি কোনো সৃষ্টির হাতে নয়, বরং তা একমাত্র আসমান ও জমিনের মালিকের হাতে। কোনো জাগতিক শক্তি মানুষের রিজিক রুখতে বা দিতে পারে না যদি আল্লাহ তা না চান। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—

أَمَّنْ هَٰذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ ۚ بَل لَّجُّوا فِي عُتُوٍّ وَنُفُورٍ

‘বলুন, তিনি যদি তার রিজিক বন্ধ করে দেন, তবে এমন কে আছে যে তোমাদের রিজিক দেবে? বস্তুত তারা অবাধ্যতা ও সত্যবিমুখতায় অবিচল রয়েছে।’ (সুরা আল-মুলক: আয়াত ২১)

হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا، فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ

‘নিশ্চয়ই কোনো প্রাণী তার জন্য নির্ধারিত রিজিক পুরোপুরি গ্রহণ করার আগে মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় রিজিক অন্বেষণ করো।’ (ইবনে মাজাহ ২১৪৪. বাইহাকি ১০০৫)

আল্লাহর এই চারটি শিক্ষা একজন মানুষের ভেতরের ভয়, হতাশা ও অহংকার দূর করে দেয়। যখন কেউ বিশ্বাস করে যে সামান্য ভালো কাজের বিনিময়ও বহুগুণ এবং রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ, তখন দুনিয়ার অন্যায্য লোভ ও দুশ্চিন্তা কেটে যায়। আবার যখন সে মনে রাখে নিজের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং ভুল হলে দ্রুত ক্ষমা চাইতে হবে, তখন তার জীবন এক চমৎকার নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মিক শান্তিতে ভরে ওঠে। এই কুরআনিক মূলনীতিগুলো অন্তরে ধারণ করাই মূলত ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .