Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

শিশু কাঁদলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করা যাবে কি?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

শিশু কাঁদলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করা যাবে কি?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত। জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের মূল দায়িত্ব হলো সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে তা সম্পন্ন করা, একই সঙ্গে মুসল্লিদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনে এ বিষয়ে রয়েছে এক অনন্যসাধারণ ও মানবিক দৃষ্টান্ত, যা যুগ যুগ ধরে মানবসমাজকে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার শিক্ষা দিয়ে আসছে।

১. শিশুর কান্না শুনে জামাতের নামাজ সংক্ষিপ্ত করা

নবীজি (স.) মসজিদে নামাজে দাঁড়ালে কখনো তা দীর্ঘ করে আদায় করতেন। কিন্তু হঠাৎ কোনো শিশুর কান্নার শব্দ কানে এলে তিনি তৎক্ষণাৎ নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—

إِنِّي لَأَقُومُ فِي الصَّلَاةِ أُريدُ أَنْ أُطُولَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَاوَزُ فِي صَلَاتِي؛ كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ

‘আমি নামাজে দাঁড়াই এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা করি। কিন্তু কোনো শিশুর কান্নার শব্দ শুনলে আমি আমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিই, তার মায়ের কষ্টের কথা বিবেচনা করে।’ (বুখারি ৭০৭)

এই ছোট্ট ঘটনাটির গভীরে রয়েছে নবীজি (স.)-এর সুদূরপ্রসারী ও অসাধারণ মমতাবোধ। তিনি শুধু শিশুর কান্না শুনেই ক্ষ্যান্ত হননি, বরং সন্তানের কান্নায় জননী যে চরম মানসিক অস্থিরতা ও কষ্টে ভুগবেন, সেই সুক্ষ্ম অনুভূতিকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

২. ইবাদতের পরিবেশে শিশুদের সহজ ও স্বাভাবিক উপস্থিতি

নবীজির মমতা ও দয়া শুধু শিশুর কান্নার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নামাজের পবিত্র পরিবেশেও তিনি শিশুদের উপস্থিতি ও স্বাভাবিক আচরণকে অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করতেন।

নাতনিকে কোলে নিয়ে নামাজ: হজরত আবু কাতাদা (রা.)-এর আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) মসজিদে নামাজ পড়ানোর সময় তার আদরের নাতনি উমামাহ বিনতে জয়নব (রা.)-কে কোলে তুলে নিতেন। তিনি যখন কিয়ামে (দাঁড়ানো অবস্থায়) থাকতেন, তখন তাকে কোলে রাখতেন এবং রুকু বা সেজদায় গেলে তাকে পরম যত্নে নিচে বসিয়ে দিতেন।’ (বুখারি ৫১৬)

পিঠে চড়ে বসা: ‘একবার তিনি সেজদারত অবস্থায় থাকাকালীন তার এক নাতি এসে তার পিঠে চড়ে বসে। নবীজি শিশুটির নিজের ইচ্ছা ও আনন্দ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সেজদা দীর্ঘ করেন এবং তাড়াহুড়া করে তাকে নামিয়ে দেননি। সাহাবিদের কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, শিশুটি নিজের ইচ্ছা পূরণ করার আগে তাকে নামিয়ে দেওয়া তিনি পছন্দ করেননি।’ (নাসাঈ ১১৪১)

শিশু কাঁদলে তিনি যেমন স্নেহের সঙ্গে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, তেমনি শিশু তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে খেলা করলে তার শিশুসুলভ আনন্দেও কখনো বাধা দিতেন না।

৩. সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ নামাজের অনুপম সৌন্দর্য

‘নামাজ সংক্ষিপ্ত করা’ বলতে কখনোই তাড়াহুড়োভরা বা রুকু-সেজদা অসম্পূর্ণ রেখে নামাজ আদায় করা বোঝায় না। বরং জামাতে অংশগ্রহণকারী মানুষের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে নামাজ আদায় করাই এর মূল শিক্ষা।

হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পেছনে এমন নামাজ আদায় করেছেন, যা একই সঙ্গে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণ ছিল। (মুসলিম ৪৬৯)

৪. ইমামদের জন্য নবীজির সাধারণ ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা

জামাতে নামাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে নবীজি (স.) সাধারণ ইমামদের জন্যও অত্যন্ত চমৎকার ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন—

إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ لِلنَّاسِ، فَلْيُخَفِّفْ؛ فَإِنَّ فِيهِمُ الضَّعِيفَ وَالسَّقِيمَ وَالْكَبِيرَ

‘তোমাদের কেউ যখন মানুষকে নিয়ে নামাজ পড়ায়, তখন সে যেন নামাজ সংক্ষিপ্ত করে। কারণ তাদের মধ্যে দুর্বল, অসুস্থ ও বয়স্ক লোক থাকে।’ তবে কেউ একা নামাজ পড়লে সে নিজের ইচ্ছামতো দীর্ঘ করতে পারে।’ (বুখারি ৭০৩)

ইমাম যখন বহু মানুষকে নিয়ে জামাত পরিচালনা করবেন, তখন তার নিজের ব্যক্তিগত ইবাদতের দীর্ঘ চাওয়ার চেয়ে মুসল্লিদের সামর্থ্য, বয়স, শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যস্ততার দিকটি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

৫. আধুনিক বাস্তবতায় নবীজির এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা

আজকের ব্যস্ত ও আধুনিক যুগে ছোট ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মায়েদের অনেক সময় জামাতে বা মসজিদে নামাজ আদায় করতে হয়। শিশুটি হঠাৎ কেঁদে উঠলে বা অস্থিরতা প্রকাশ করলে মায়েদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একধরনের অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ কাজ করে।

কিন্তু নবীজির এই সোনালী সুন্নাহ ও সুমহান আচরণ আমাদের শিক্ষা দেয় যে— শিশু কাঁদছে বলে বিরক্ত হওয়া, মাকে মানসিকভাবে কোণঠাসা করা বা শিশুকে অপরাধীর মতো দেখা ইসলামের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। শিশুর কান্না তার সহজাত আবেগের প্রকাশ, আর মায়ের মন সেই কান্নায় ব্যাকুল হওয়াটাই প্রকৃতির নিয়ম।

একটি শিশুর কান্নার আওয়াজে সমগ্র বিশ্ববাসীর রাহমাতুল্লিল আলামীন নবীজি (স.) যেভাবে এক জননীর মানসিক কষ্ট উপলব্ধি করে নিজের নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছিলেন, তা থেকে আমাদের সমাজ ও বাস্তবতার জন্য রয়েছে গভীর শিক্ষা। ইবাদত ও বন্দেগির গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি ইবাদতের গণ্ডিতে মানুষের সামাজিক প্রয়োজন, কষ্ট ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বিবেচনা করাও ইসলামি শরিয়তের অন্যতম সৌন্দর্য। আসুন, ইবাদতের পথে মানুষের সাধারণ কষ্ট ও প্রয়োজনকে সহমর্মিতার সঙ্গে মূল্যায়ন করি—এটাই ছিল প্রিয় নবী (স.)-এর অনুপম নেতৃত্ব, হিকমাহ ও নিখাদ মমতার অপূর্ব সমন্বয়।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতায় ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচিত ৮ জন

সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতায় ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচিত ৮ জন

জোহরের ফরজের আগের ৪ রাকাত সুন্নত ছুটে গেলে করণীয় কী?

জোহরের ফরজের আগের ৪ রাকাত সুন্নত ছুটে গেলে করণীয় কী?

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে

ফরজ নামাজের স্থানেই কি সুন্নত পড়বেন, নাকি স্থান পরিবর্তন করা উত্তম?

ফরজ নামাজের স্থানেই কি সুন্নত পড়বেন, নাকি স্থান পরিবর্তন করা উত্তম?

যে বিয়েতে বরকতের দোয়া করেছিলেন নবীজি (সা.)

যে বিয়েতে বরকতের দোয়া করেছিলেন নবীজি (সা.)

ছোটবেলায় টাকা চুরি করেছিলেন, এখন পরিশোধ করবেন কিভাবে?

ছোটবেলায় টাকা চুরি করেছিলেন, এখন পরিশোধ করবেন কিভাবে?

আরও পড়ুন

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২৫ অক্টোবর ২০২৬

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২৫ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতায় ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচিত ৮ জন

হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতায় ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচিত ৮ জন

জোহরের ফরজের আগের ৪ রাকাত সুন্নত ছুটে গেলে করণীয় কী?

জোহরের ফরজের আগের ৪ রাকাত সুন্নত ছুটে গেলে করণীয় কী?

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে

শিশুদের আদর করে চুমু দেওয়া কি জায়েজ? ইসলাম কী বলে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম