সুদের টাকায় মসজিদের টয়লেট নির্মাণ: শরিয়তের বিধান কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:১২ পিএম
মসজিদে কবুা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে ইবাদতের পবিত্রতা যেমন অপরিহার্য, তেমনই ইবাদতের স্থান অর্থাৎ মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত যেকোনো কাজে হালাল উপার্জনের শর্ত আরোপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— সুদের টাকা কি মসজিদের মূল ভবনে না দিয়ে টয়লেট বা অজুখানা নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে? শরিয়তের সুস্পষ্ট ফতোয়া ও নির্দেশনার আলোকে এর উত্তর হলো— মসজিদের মূল অংশ তো বটেই, এমনকি টয়লেট বা অজুখানা নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায়ও সুদের মতো হারাম অর্থ ব্যয় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
হারাম অর্থ দিয়ে মসজিদ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা
মসজিদ আল্লাহর ঘর। এর নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্রেফ ইমানদারদের হালাল উপার্জনের ওপর ন্যস্ত। হারাম বা অবৈধ অর্থ দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করলে আল্লাহর ঘরকে অপবিত্র করা হয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ করেছেন—
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
‘একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১৮)
সুদের ভয়াবহতা ও কুরআনিক নিষেধাজ্ঞা
ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ বা সুদ গ্রহণ করা একটি মারাত্মক সামাজিক জুলুম ও শরিয়তে মহাপাপ। আল্লাহ তাআলা সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং সুদি লেনদেনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন—
ব্যবসায় ও সুদের পার্থক্য
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)
আল্লাহ ও রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট রয়েছে তা বর্জন করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো। আর যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তার রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৮-২৭৯)
সুদের সাথে সম্পৃক্তদের প্রতি অভিশাপ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস
সুদি লেনদেনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবার অপরাধ ইসলামে সমানভাবে বিবেচিত। সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪ ব্যক্তির ওপর লানত—
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করেছেন— সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়। তিনি আরও বলেছেন, অপরাধের দিক থেকে তারা সবাই সমান।’ (মুসলিম ১৫৯৮/১৫৯৭)
সুদের অর্থ নিষ্পত্তির সঠিক নিয়ম
ইসলামে সুদের অর্থ নিজের খাওয়া-পরা বা কোনো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। কোনো কারণে সুদের টাকা হস্তগত হয়ে গেলে তা ব্যবহারের সঠিক শরিয়তি নিয়মগুলো নিচে দেওয়া হলো—
- মূল মালিককে ফেরত দেওয়া: সম্ভব হলে সুদের অর্থ আসল দাতার (যার কাছ থেকে সুদ নেওয়া হয়েছিল) কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
- সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান: মূল মালিককে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে কোনো প্রকার সওয়াবের আশা না করে সেই অর্থ জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত অসচ্ছল ও দরিদ্র ব্যক্তিকে দিয়ে দিতে হবে।
- জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ: সুদের টাকা কেবল মসজিদের টয়লেট বা মূল ভবনেই নয়, বরং রাস্তার সংস্কার, রাস্তার বাতি বসানো, নলকূপ ও কূপ খননসহ কোনো সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজেও ব্যয় করা যাবে না।
ইমানদারদের জন্য আবশ্যক হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে হালাল রিজিক অন্বেষণ করা। পবিত্র মসজিদ হলো আল্লাহর ইবাদতের শ্রেষ্ঠ স্থান, যা একমাত্র হালাল ও পবিত্র অর্থ দিয়েই নির্মাণ ও পরিচালনা করা জরুরি। সুদের মতো মারাত্মক অভিশপ্ত অর্থ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে অর্জিত সুদের টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া উপযুক্ত নিঃস্বদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করাই মুমিনের একমাত্র করণীয়।

