রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে কোন ওয়াক্তে কতটুকু লম্বা কিরাত পড়তেন?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নামাজ হলো মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। নামাজে কিরাত পাঠের ধরণ ও দৈঘ্য কেমন হবে, সে বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত দিয়ে গেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কিরাতের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা থাকলেও তা মানুষের সুবিধা ও পরিপার্শ্বিক পরিস্থিতির আলোকে ছিল অত্যন্ত নমনীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ।
ওয়াক্তভেদে কিরাতের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা
নবী করিম (সা.) সাধারণত ফজর ও জোহরের নামাজে দীর্ঘ কিরাত, আসর ও এশায় মাঝারি এবং মাগরিবে সংক্ষিপ্ত কিরাত পাঠ করতেন। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের এই সুনির্দিষ্ট ধারার বিবরণ পাওয়া যায়। হজরত সুলাইমান ইবনু ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন—
مَا صَلَّيْتُ وَرَاءَ أَحَدٍ أَشْبَهَ صَلاَةً بِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ فُلاَنٍ. قَالَ سُلَيْمَانُ: كَانَ يُطِيلُ الرَّكْعَتَيْنِ الأُولَيَيْنِ مِنَ الظُّهْرِ وَيُخَفِّفُ الأُخْرَيَيْنِ، وَيُخَفِّفُ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِأَوْسَاطِ الْمُفَصَّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الصُّبْحِ بِطِوَالِ الْمُفَصَّلِ
‘আমি অমুক ব্যক্তি অপেক্ষা এমন আর কারো পেছনে নামাজ আদায় করিনি, যার নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের সঙ্গে এত বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। সুলাইমান বলেন, তিনি জোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষ দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত করতেন; আসরের নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন; মাগরিবে ‘কিসারুল মুফাসসাল’ (ছোট সুরাসমূহ), এশায় ‘আওসাতুল মুফাসসাল’ (মাঝারি সুরাসমূহ) এবং ফজরে ‘তিওয়ালুল মুফাসসাল’ (দীর্ঘ সুরাসমূহ) পাঠ করতেন।’ (নাসাঈ ৯৮২)
মুফাসসাল সুরার শ্রেণিবিভাগ
প্রখ্যাত ফকিহ শাইখ ইবনু উসাইমিন (রহ.) মুফাসসাল সুরাগুলোর যে শ্রেণিবিভাগ উল্লেখ করেছেন, তা হলো—
- দীর্ঘ মুফাসসাল: সুরা কাফ থেকে সুরা আন-নাবা পর্যন্ত।
- মাঝারি মুফাসসাল: সুরা আন-নাবা থেকে সুরা আদ-দুহা পর্যন্ত।
- ছোট মুফাসসাল: সুরা আদ-দুহা থেকে আল-কুরআনের শেষ (সুরা আন-নাস) পর্যন্ত। (আশ-শারহুল মুমতি আলা যাদিল মুস্তাকনি ৩/৭৫)
ফজরের নামাজে কিরাতের দৈর্ঘ্য ও বৈচিত্র্য
স্বাভাবিক অবস্থায় নবী করিম (সা.) ফজরের নামাজে ৬০ থেকে ১০০ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করতেন, যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধ পারার কাছাকাছি। তিনি প্রায়শই সুরা কাফ, আস-সাজদাহ, আল-মুলক, আল-মুমিনুন কিংবা আস-সাফফাত তেলাওয়াত করতেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সাইব (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, একবার মক্কায় ফজরের নামাজে তিনি সুরা মুমিনুন শুরু করেন এবং মুসা, হারুন বা ঈসা (আ.)-এর বর্ণনায় পৌঁছালে কাশি আসার কারণে রুকুতে যান।’ (মুসলিম ৪৫৫)
তবে বিশেষ প্রয়োজনে রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরকালে সুরা নাস ও সুরা ফালাকের মতো ছোট সুরা দিয়েও ফজরের সালাত আদায় করেছেন। (আবু দাউদ ১৪৬২)
মুক্তাদিদের অবস্থা ও পরিস্থিতি বিবেচনার নির্দেশ
ইমামদের উচিত মুক্তাদিদের অবস্থা ও প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শিশুদের কষ্টের কথা চিন্তা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنِّي لأَدْخُلُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلاَتِي مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ
‘আমি নামাজে দাঁড়াই এবং তা দীর্ঘ করার ইচ্ছা রাখি, অতঃপর কোনো শিশুর কান্না শুনে আমি নামাজ সংক্ষিপ্ত করি। কারণ আমি জানি, তার কান্নায় তার মায়ের অন্তরে কতটা তীব্র কষ্ট হয়।’ (বুখারি ৭০৭, মুসলিম ৪৭০)
ইমাম মালিক (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকে, সফরের তাড়া থাকে অথবা কারো সহযোগিতার জন্য যেতে হয়, তবে সংক্ষিপ্ত কিরাতে নামাজ আদায় করা যায়। (শরহু সহিহিল বুখারি, ইবনু বাত্তাল ২/৩৮৫)।
এমনকি মহানবী (সা.) কখনো কখনো ফজরে সুরা আত-তাকভির কিংবা সুরা আয-যিলযালের মতো ছোট সুরাও পাঠ করেছেন। (আবু দাউদ ৭৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের শেখায় যে, নামাজে কিরাত পাঠের ক্ষেত্রে মূল চেতনা হলো একনিষ্ঠতা ও ভারসাম্য। নামাজকে একদিকে যেমন সুন্দর ও প্রাঞ্জল তেলাওয়াতে প্রাণবন্ত রাখা প্রয়োজন, তেমনি মুক্তাদিদের সামর্থ্য, বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের উপস্থিতির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া সুন্নাহর অন্যতম রূপ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সুন্নাহর অনুসরণে কিরাত পাঠের এই ভারসাম্য বজায় রাখাই প্রকৃত হেদায়েতের পথ।

