টানা তিন জুমা না পড়লে পরিণতি কী হবে?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সপ্তাহের সাতটি দিনের মাঝে জুমার দিন মুমিনের জন্য এক পরম আশীর্বাদ ও সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে আসে। মহান আল্লাহ এই দিনটিকে অন্যান্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও আলাদা মর্যাদা দান করেছেন। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর তুলনায় জুমার নামাজের ফজিলত ও গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই অলসতা বা ইচ্ছাকৃতভাবে এই নামাজ ত্যাগ করার পরিণতিও অত্যন্ত ভয়াবহ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এই দিনে দুনিয়াবি ব্যস্ততা পেছনে ফেলে নামাজে শামিল হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জুমার মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব
জুমার দিনটি মুমিনের জন্য এক পরম আনন্দের ক্ষণ। কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা এই নামাজের আহ্বান এলে সমস্ত কেনাবেচা ও পার্থিব ব্যস্ততা বন্ধ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো। এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’ (সুরা আল-জুমুআ: আয়াত ৯)
আল্লাহর রাসুল (সা.) এই দিনটিকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক উৎসবের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন—
إِنَّ هَذَا يَوْمُ عِيدٍ جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ
‘নিশ্চয়ই এই দিনটি ঈদ বা আনন্দের দিন, যা আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ (ইবনে মাজাহ ১০৯৮)
জুমার আমলের অশেষ সাওয়াব
জুমার দিন গোসল করে তাড়াতাড়ি হেঁটে মসজিদে যাওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার বিনিময়ে রয়েছে অশেষ সাওয়াব। হযরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ غَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ وَدَنَا مِنَ الإِمَامِ فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ كَانَ لَهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ عَمَلُ سَنَةٍ أَجْرُ صِيَامِهَا وَقِيَامِهَا
‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে গোসল করাবে ও নিজে গোসল করবে, ভোর ভোর হেঁটে মসজিদে যাবে, কোনো বাহনে চড়বে না, ইমামের কাছাকাছি বসবে, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে এবং অনর্থক কিছু করবে না— সে মসজিদে যাওয়ার প্রতি পদে পদে এক বছর নফল রোজা ও এক বছর নফল নামাজের সওয়াব পাবে।’ (আবু দাউদ ৩৪৫)
পরপর তিন জুমা না পড়ার ভয়াবহ পরিণতি
অপার ফজিলতপূর্ণ এই নামাজ যদি কেউ কোনো উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য ওজর ছাড়া অবহেলা করে ছেড়ে দেয়, বিশেষ করে পরপর তিন জুমা বর্জন করে, তবে তার হৃদয়ে মোহর মেরে দেওয়া হয়। হাদিসে পাকে এসেছে—
مَنْ تَرَكَ ثَلاَثَ جُمَعٍ تَهَاوُنًا بِهَا طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قَلْبِهِ
‘যে ব্যক্তি নিছক অবহেলা, অলসতা ও গাফলতি করে পরপর তিনটি জুমার নামাজ পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।’ (তিরমিজি ৫০২, আবু দাউদ ১০৫২, মুসলিম ১৯৯৯)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমার নামাজ বর্জন করল, সে যেন ইসলামকে নিজের পেছনের দিকে ছুড়ে ফেলল।’ (মুসলিম)
যাদের জন্য জুমার নামাজ ছাড় রয়েছে
সবার জন্য জুমার সালাত আবশ্যক হলেও বিশেষ চার বা পাঁচ শ্রেণির মানুষকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْجُمُعَةُ حَقٌّ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ فِي جَمَاعَةٍ إِلاَّ أَرْبَعَةً: عَبْدٌ مَمْلُوكٌ، أَوْ امْرَأَةٌ، أَوْ صَبِيٌّ، أَوْ مَرِيضٌ
‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জামাতে জুমার সালাত আদায় করা একটি অবশ্যপালনীয় কর্তব্য; তবে চার শ্রেণির লোক ব্যতীত—ক্রীতদাস, নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক ও অসুস্থ ব্যক্তি। (অন্য বর্ণনায় মুসাফিরের কথা এসেছে)। (আবু দাউদ ১০৬৭)
নামাজ ত্যাগের ভয়াবহ পরিণাম
নামাজ হলো একজন মুমিনের ঈমানের প্রধান পরিচয় ও নিদর্শন। নামাজ ত্যাগকারীর বিষয়ে সাহাবিদের বক্তব্য অত্যন্ত কঠোর। হজরত ওমর (রা.) বলতেন, ‘নামাজ ত্যাগকারীর ইসলামে কোনো অংশ নেই।’ (বায়হাকি ১৫৫৯)
হজরত আলি (রা.) বলেছেন, ‘যে নামাজ আদায় করে না, সে চরম পথভ্রষ্টতার মাঝে রয়েছে।’ (বায়হাকি ৬২৯১)
এসব প্রামাণ্য বক্তব্য প্রমাণ করে, ইচ্ছা করে নামাজ ছেড়ে দেওয়া দ্বীনের ভিত্তি ধ্বংসের শামিল।
জুমার নামাজ কেবল সপ্তাহের একটি নিয়মিত ইবাদত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, উম্মাহর ঐক্য এবং প্রভূর সন্তুষ্টি অর্জনের এক অপূর্ব মাধ্যম। পার্থিব সামান্য লাভ বা অলসতার বশে এই মহান ইবাদত থেকে দূরে থাকা নিজের অন্তরকে কলুষিত করার শামিল। তাই প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষের উচিত ওয়াক্তমতো ফরজ নামাজের পাশাপাশি জুমার দিনটিকে যথাযথ সম্মান দেওয়া এবং প্রভুর দরবারে হাজির হয়ে নিজের কল্যাণ কামনায় মশগুল হওয়া।

