ভিন্ন মতাবলম্বীদের সঙ্গে মুসলিমদের আচরণ কেমন হবে?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পার্থিব জীবনে দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারার বৈচিত্র্য মানবজাতির এক স্বাভাবিক নিয়তি। একই পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শের মানুষের মধ্যেও মতপার্থক্য তৈরি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে কখনো অস্বীকার করেনি; বরং ভিন্নমত প্রকাশ ও তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে কীভাবে ন্যায়বিচার, শালীনতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে, কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে তার নিখুঁত রূপরেখা প্রকাশ পেয়েছে।
আধুনিক সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংকট
আজকের যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্র বহুগুণ প্রসারিত হলেও পরমতের প্রতি সহিষ্ণুতার পারদ আশঙ্কাজনকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু ভিন্নমত প্রকাশ পেলেই শুরু হয় বিদ্রূপ, কটূক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। এমনকি ধর্মীয় ক্ষেত্রেও এই বৈরিতা মানুষকে সম্পর্কের ইতি টানতে বাধ্য করছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়— সত্যের বিষয়ে দৃঢ় থেকে কীভাবে প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে ভিন্নমতের মানুষের মুখোমুখি হতে হয়।
সত্য উপস্থাপনায় ইসলামি হিকমত ও নৈতিকতা
ইসলাম কেবল সত্য কথা বলাকেই যথেষ্ট মনে করে না, বরং সেই সত্যকে উপস্থাপন করার পদ্ধতিকেও সমান গুরুত্ব দেয়। যুক্তি ও দলিলের পাশাপাশি কথা বলার ভাষা হতে হবে শালীন ও মার্জিত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে দাওয়াত ও বিতর্কের অনন্য নির্দেশনা দিয়ে ইরশাদ করেছেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সৌজন্যপূর্ণ পন্থায়। (সুরা আন-নাহল: আয়াত ১২৫)
এমনকি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে, সে বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৮)
কঠোরতা ও শত্রুর মুখোমুখি বাকসংযম
মহানবী (সা.) অমুসলিম, মুনাফিক ও বিরোধীদের তোপ ও অশালীন ভাষার জবাবে কখনো নিজের নৈতিক চরিত্র বিসর্জন দেননি। এমনকি কুরআনে দেখা যায়, চরম অত্যাচারী ফেরাউনের কাছেও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসা ও হারুন (আ.)-কে কোমল ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ও কোমল ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা তহা: আয়াত ৪৪)
তাফসিরে ইবনে কাসির (৪/৫৪২) ও মাআরিফুল কোরআনে (৬/৭০২) উল্লেখ এসেছে, ফেরাউনের মতো জালিমের সঙ্গে যদি কথাবার্তায় এমন মার্জিত ভাষা বজায় রাখার হুকুম থাকে, তবে সাধারণ মুমিনের সঙ্গে মতভেদে বাকসংযম রক্ষা করা কতটা জরুরি! ইসলামে আহলে কিতাবদের সঙ্গে যুক্তিতর্কের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে—
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
‘আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক কর না।’ (সুরা আল-আনকাবুত: আয়াত ৪৬)
অন্যায়ের জবাব অন্যায়ে না দেওয়া: সুন্নাহর ব্যবহারিক শিক্ষা
কারো অনভিপ্রেত আচরণ যেন নিজের আচরণের মানদণ্ড না হয়ে দাঁড়ায়— সে শিক্ষা মহানবী (সা.) দিয়েছেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস তার উজ্জ্বল প্রমাণ—
أَنَّ رَجُلاً اسْتَأْذَنَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «ائْذَنُوا لَهُ، فَبِئْسَ أَخُو العَشِيرَةِ» أَوْ «بِئْسَ ابْنُ العَشِيرَةِ»، فَلَمَّا دَخَلَ أَلاَنَ لَهُ القَوْلَ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، قُلْتَ مَا قُلْتَ، ثُمَّ أَلَنْتَ لَهُ القَوْلَ؟ فَقَالَ: «أَيْ عَائِشَةُ، إِنَّ شَرَّ النَّاسِ مَنْزِلَةً عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ القِيَامَةِ مَنْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتِّقَاءَ فُحْشِهِ»
‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আসার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, ‘তাকে অনুমতি দাও; সে তার গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট ব্যক্তি!’ কিন্তু লোকটি প্রবেশ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সঙ্গে অত্যন্ত নম্রভাবে কথা বললেন। পরবর্তীতে আয়েশা (রা.) এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বললেন, ‘হে আয়েশা! কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে সর্বনিকৃষ্ট সে-ই, যার অশালীন ও কটু আচরণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাকে পরিহার করে চলে।’ (বুখারি ৬০৫৪)
নবীজি (সা.) আয়েশা (রা.)-কে আরও উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—
يَا عَائِشَةُ عَلَيْكِ بِالرَّفْقِ
‘হে আয়েশা! তুমি সর্বাবস্থায় নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন কর।’ (বুখারি: ৬২৫৬)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আমাদের দায়িত্ব
অনলাইন বা অফলাইন দুনিয়ায় কাউকে পছন্দ না করা মানেই তার ওপর গালিগালাজ বর্ষণ করা নয়। সামাজিক মাধ্যমে গুজবের ডালপালা ছড়ানো, কুধারণা পোষণ কিংবা অন্যকে হেয় করা সম্পর্কে কুরআনের কঠোর নিষেধ রয়েছে—
وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ
‘তোমরা একে অপরকে মন্দ ও অপমানজনক উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১)
পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ আরও বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا
‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান ও ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ। আর তোমরা কারো গোপন দোষ অনুসন্ধান কর না এবং একে অপরের গিবত কর না।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১২)
ইসলামি আদর্শ দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং তা ন্যায়নিষ্ঠা ও সৌজন্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়, এ বোধ জাগ্রত করা আজ সময়ের দাবি। সামাজিক মাধ্যমে কিংবা বাস্তব জীবনে কারো ভিন্নমতের বিপরীতে গালিগালাজ বা বিষোদ্গার না করে প্রজ্ঞা, তথ্য যাচাই ও মার্জিত ভাষার পরিচয় দেওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ও নববী শিষ্টাচার বজায় রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

