শায়খ আহমাদুল্লাহ
চোর চিহ্নিত করতে চাল পড়া বা বাটি চালান, ইসলাম কী বলে?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম
শায়খ আহমাদুল্লাহ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পার্থিব জীবনে নানা অপরাধ ও চুরির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তা মীমাংসার জন্য ইসলাম সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সামাজিক অজ্ঞতা বা কুসংস্কারের বশে অনেক সময় মানুষ চালপড়া, তেলপড়া কিংবা বাটি চালানের মতো অবৈজ্ঞানিক ও শরিয়তবহির্ভূত মাধ্যমের আশ্রয় নেয়। সম্প্রতি একটি ইসলামি আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহকে চালপড়া দিয়ে চোর ধরা সংক্রান্ত প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও তথ্যবহুল জবাব দেন।
অপরাধ প্রমাণে শরিয়তের মূলনীতি
কেউ চুরি করলে বা কোনো অপরাধ সংঘটিত করলে তা প্রমাণের জন্য ইসলামি শরিয়ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। চালপড়া বা বাটি চালান দিয়ে চোর বা অপরাধী শনাক্তকরণের কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। অপরাধ প্রমাণের সর্বজনীন মূলনীতি তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বিচারব্যবস্থায় প্রমাণের ক্ষেত্রে নবীজির নীতি হলো—
الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي، وَالْيَمِينُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ
‘প্রমাণ পেশ করার দায়িত্ব হলো যিনি দাবি করেন বা অভিযোগ আনেন তাঁর ওপর, আর অস্বীকারকারীর ওপর রয়েছে কসম বা শপথ।’ (বুখারি ও মুসলিমের মূলনীতির আলোকে বিবৃত প্রসিদ্ধ আইনি নীতি)
সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করতে পারলে তবেই দাবি সাব্যস্ত হয়, অন্যথায় কেবল চালপড়া বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা শরিয়তসম্মত নয়।
বাটি চালান ও অলৌকিকতার প্রকৃত রূপ
ছোটবেলায় অনেকেরই বাটি চালান দেওয়ার দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেখানে মন্ত্র বা বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাটি অলৌকিকভাবে চোরের ঘরে চলে যায় বলে দাবি করা হয়। শায়খ আহমাদুল্লাহ স্পষ্ট করেন যে, এই ধরনের কাণ্ড কেবল মুসলমানরা নয়, বরং হিন্দুরাও বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে বাটি চালানের মাধ্যমে ঘটিয়ে থাকে।
মনে রাখতে হবে, অলৌকিকত্ব দেখলেই তা সবসময় সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। অনেক সময় জাদুটোনা, দুষ্টু জিন বা শয়তানের প্রভাবেও অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেতে পারে, এমনকি কাফেরদের মাধ্যমেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অলৌকিক কিছু ঘটলেই তাকে আল্লাহর কোনো অলৌকিক সাহায্য বা সত্যতার প্রমাণ মনে করার সুযোগ নেই। ইসলামি আদালত বা কোনো বিচারব্যবস্থায় বাটি চালান বা চালপড়ার মতো কাল্পনিক ভিত্তিকে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
চালপড়ার কোনো দোয়া আছে কি?
যেহেতু চালপড়া বা বাটি চালানের পুরো প্রক্রিয়াটিই ইসলামে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবৈজ্ঞানিক, তাই এর জন্য পবিত্র কুরআন বা হাদিসে বিশেষ কোনো দোয়া থাকার প্রশ্নই ওঠে না। এ প্রসঙ্গে শায়খ আহমাদুল্লাহ হাস্যরসের ছলে সুন্দর একটি মন্তব্য করেন যে, ইসলামে চালপড়ার কোনো দোয়া নেই, তবে চাল খাওয়ার সুনির্দিষ্ট দোয়া বা পদ্ধতি রয়েছে—মুচকি হেসে তিনি বলেন, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে সুস্বাদু চাল বা ভাত খেয়ে ফেলতে পারেন! কিন্তু চালপড়া বা বাটি চালানের নামে কুসংস্কার টিকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে শরিয়ত নির্ধারিত ন্যায়ভিত্তিক ও প্রামাণিক উপায়ে সমাজ পরিচালনা করাই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। চালপড়া বা বাটি চালানের মতো ভিত্তিহীন প্রথা থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে সচেতনতার বিকল্প নেই।

