Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

অমুসলিম ছেলের সঙ্গে মুসলিম মেয়ের পালিয়ে বিয়ে: ইসলাম কী বলে?

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

অমুসলিম ছেলের সঙ্গে মুসলিম মেয়ের পালিয়ে বিয়ে: ইসলাম কী বলে?

বর্তমান সময়ে প্রেমের সম্পর্ক, পারিবারিক বিরোধ এবং সামাজিক নানা বাস্তবতার কারণে তরুণ-তরুণীদের পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার ঘটনা কম নয়। তবে যখন একটি মুসলিম মেয়ে কোনো অমুসলিম ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় এবং পরে তারা বিয়ে করে, তখন বিষয়টি শুধু পারিবারিক বা সামাজিক থাকে না; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে ধর্মীয় বিধান ও ইসলামী শরিয়তের প্রশ্ন। 

অনেকের মনে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, একজন মুসলিম মেয়ে যদি কোনো অমুসলিম ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, সেই বিয়ে কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ, সামাজিক রীতি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এ বিষয়ে কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী ফিকহের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। 

ইসলামের মূলধারার ফিকহি মত অনুযায়ী, একজন মুসলিম নারীর জন্য কোনো অমুসলিম পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ নয়। পুরুষটি হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিক বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী হোন, এমনকি তিনি ইহুদি বা খ্রিস্টান, অর্থাৎ আহলে কিতাব হলেও মুসলিম নারীর সঙ্গে তার ইসলামী নিকাহ বৈধ হবে না। 

চার সুন্নি মাযহাব—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এ বিষয়ে মূলনীতিগতভাবে একমত।

কুরআনের সূরা আল-বাকারা ২২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুশরিক পুরুষদের সঙ্গে মুসলিম নারীদের বিবাহ না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। 

আবার সূরা আল-মুমতাহিনা ৬০ নম্বর সূরার ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা তাদের জন্য হালাল নয় এবং তারাও তাদের জন্য হালাল নয়।’ 

ইসলামী ফকিহরা এসব আয়াতের ভিত্তিতেই মুসলিম নারী ও অমুসলিম পুরুষের বিবাহকে অবৈধ বলে বিবেচনা করেছেন। মিসরের দারুল ইফতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্বীকৃত ফিকহি প্রতিষ্ঠানও একই অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

এখানে একটি বিষয় নিয়ে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি হয়। কুরআনের সূরা আল-মায়িদা ৫ নম্বর আয়াতে মুসলিম পুরুষের জন্য আহলে কিতাব—অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টান—নারীকে বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনুমতিকে মুসলিম নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে করা যাবে না। 

অর্থাৎ মুসলিম পুরুষের জন্য যে বিশেষ অনুমতি রয়েছে, মুসলিম নারীর জন্য তা নেই। ইসলামী ফিকহে এই দুই বিষয়কে আলাদা বিধানের অধীন রাখা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন আসে, কোনো মুসলিম মেয়ে যদি পরিবারের অমতে অমুসলিম ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় এবং তারা নিজেদের মধ্যে বিয়ে করে, তাহলে কি সেই বিয়ে হয়ে যাবে? 

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এর উত্তর হলো, না। কারণ পালিয়ে যাওয়া নিজে কোনো বিবাহের বৈধতা সৃষ্টি করে না। কোনো নারী-পুরুষ একে অপরকে ভালোবাসেন, পরস্পরের সম্মতি রয়েছে, পরিবার তাদের মেনে নিচ্ছে না, তারা বাড়ি থেকে চলে গেছেন কিংবা নিজেরাই কোনোভাবে বিয়ের ঘোষণা দিয়েছেন—এসবের কোনোটিই অমুসলিম পুরুষের সঙ্গে মুসলিম নারীর নিষিদ্ধ বিবাহকে বৈধ করে না।

এমনকি তারা আদালতে গিয়ে বিয়ে নিবন্ধন করলেও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আলাদা থাকবে। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী কোনো বিবাহ নিবন্ধিত হয়েছে কি না, সেটি একটি আইনি প্রশ্ন; আর ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই বিবাহ বৈধ কি না, সেটি একটি ধর্মীয় প্রশ্ন। ফলে শুধু কোর্ট ম্যারেজের কাগজ থাকলেই মুসলিম নারী ও অমুসলিম পুরুষের সম্পর্ক ইসলামী নিকাহে পরিণত হয় না।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি ওই অমুসলিম পুরুষ সত্যিকারভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মুসলিম হিসেবে বিবেচিত হবেন। এরপর ওই নারী ও পুরুষ চাইলে ইসলামী শরিয়তের নিয়ম মেনে নিকাহ করতে পারবেন। 

কিন্তু শুধু মেয়েটিকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে মুখে কালিমা পড়া, কাগজে মুসলিম পরিচয় নেওয়া কিংবা সাময়িকভাবে ইসলাম গ্রহণের অভিনয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম গ্রহণ মূলত বিশ্বাসের বিষয়; তাই তা হতে হবে আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত।

আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যদি অমুসলিম ছেলে বলে, ‘আমি পরে ইসলাম গ্রহণ করব’, তাহলে সেই ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বর্তমানে তাকে মুসলিম স্বামী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে সত্যিকারভাবে ইসলাম গ্রহণ না করছে, ততক্ষণ সে অমুসলিমই থাকবে। আর অমুসলিম পুরুষের সঙ্গে মুসলিম নারীর ইসলামী নিকাহ বৈধ নয়।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, কোনো মুসলিম মেয়ে যদি এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার করণীয় কী? ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু নিষেধ করে সমস্যার সমাধান হয় না; বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। মেয়েটি যদি ওই ছেলেকে সত্যিই বিয়ে করতে চায়, তাহলে প্রথমে তাকে ইসলামের বিষয়টি বুঝতে হবে এবং ছেলেটিও যদি ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী হন, তাকে স্বাধীনভাবে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ দিতে হবে। 

কিন্তু বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে মুসলিম বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়।

একই সঙ্গে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মুসলিম মেয়ের পছন্দকে অযৌক্তিকভাবে উপেক্ষা করা কিংবা তার ওপর জোর করে বিয়ে চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের আদর্শ নয়। ইসলামে নারীর সম্মতির গুরুত্ব রয়েছে। 

রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাদিসে নারীর সম্মতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে। ফলে পরিবার যদি মেয়ের পছন্দের ব্যাপারে আপত্তি করে, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে কারণ বোঝা, অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করাই উত্তম পথ। তবে পরিবারের আপত্তি থাকলেই শরিয়তের স্পষ্ট বিধান পরিবর্তিত হয়ে যায় না।

এখানে আরও একটি ভুল ধারণা রয়েছে—‘দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, তাই তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে; তাদের সম্মতি থাকলেই ইসলামে বিয়ে হয়ে যাবে।’ বিষয়টি এত সরল নয়। ইসলামী নিকাহ নিছক ব্যক্তিগত প্রেমের ঘোষণা নয়; এটি একটি শরিয়তসম্মত চুক্তি, যার নির্দিষ্ট শর্ত ও বিধান রয়েছে। 

বর-কনের ধর্মীয় যোগ্যতা, ইজাব-কবুল, মোহর, সাক্ষী এবং সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধানগুলো বিবেচনা করতে হয়। বিভিন্ন মাযহাবে কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও মুসলিম নারী ও অমুসলিম পুরুষের বিয়ের মূল নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে চার মাযহাবের অবস্থান স্পষ্ট।

তাই ‘পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছি’—এই বক্তব্য নিজে ইসলামী বিবাহের প্রমাণ নয়। বরং প্রথমে দেখতে হবে, যাকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুসলিম কি না এবং নিকাহর প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না। অমুসলিম পুরুষের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তটিই পূরণ না হওয়ায় মুসলিম নারীর সঙ্গে ইসলামী নিকাহ সংঘটিত হয় না।

তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটে গেলে সংশ্লিষ্ট নারীকে অপমান, নির্যাতন কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করাও ইসলামের সমাধান নয়। ধর্মীয় বিধান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি তার নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং আইনগত অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। 

বিশেষ করে যদি সেখানে সন্তান, সম্পত্তি, নাগরিকত্ব, নিবন্ধিত বিবাহ বা নির্যাতনের মতো বিষয় জড়িয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয় আইনজীবী এবং যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে একজন মুসলিম মেয়ের সঙ্গে একজন অমুসলিম ছেলের পালিয়ে গিয়ে করা বিয়ে বৈধ নিকাহ হিসেবে গণ্য হয় না। ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার অনুভূতি কোনো হারাম সম্পর্ককে হালাল করে না। 

একইভাবে পরিবারের আপত্তি থাকলেও পালিয়ে যাওয়া শরিয়তের বিকল্প পথ নয়। যদি অমুসলিম পুরুষ আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন নতুন পরিস্থিতিতে শরিয়তের নিয়ম মেনে নিকাহ করা সম্ভব।

অতএব, বিষয়টির সারকথা খুব পরিষ্কার—মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা ইসলামী শরিয়তে বৈধ নয়; পালিয়ে যাওয়া, পারস্পরিক সম্মতি বা কোর্ট ম্যারেজ—কোনোটিই এই বিধান পরিবর্তন করতে পারে না। 

আর যদি পুরুষটি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে ইসলাম গ্রহণের পর শরিয়তের নির্ধারিত নিয়মে নতুন করে নিকাহ করতে হবে।

এ বিষয়ে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ হলো, আবেগের পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা, স্বীকৃত ফিকহি মতামত এবং দেশের প্রচলিত আইন—তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু দুটি মানুষের জীবন নয়, পরবর্তী প্রজন্ম ও দুই পরিবারের জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম