Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

জীবনবীমার টাকায় চিকিৎসা নেওয়া কি শরিয়তসম্মত?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

জীবনবীমার টাকায় চিকিৎসা নেওয়া কি শরিয়তসম্মত?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মানুষ অসুস্থ হলে সুস্থতার আশায় কত চেষ্টাই না করে। চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে বর্তমান যুগে অনেকেই স্বাস্থ্যবীমা বা জীবনবীমার সহায়তা নিয়ে থাকেন। তবে একজন ইমানদারের জন্য কেবল সুস্থতাই শেষ কথা নয়, বরং সে চিকিৎসার অর্থ উৎসগতভাবে হালাল কি না—তাও এক বিরাট বিবেচনার বিষয়। সুদের লেনদেন, অনিশ্চয়তা (গারার) এবং জুয়াসদৃশ (কিমার) উপাদানের কারণে প্রচলিত বাণিজ্যিক বীমা ব্যবস্থা নিয়ে শরিয়তবিদদের মাঝে স্পষ্ট আপত্তি রয়েছে। এই বাস্তবতায়, জীবনবীমা থেকে প্রাপ্ত বা বীমা কোম্পানির পরিশোধিত টাকায় চিকিৎসা গ্রহণ করা জায়েজ কি না— তা গভীরভাবে জেনে নেওয়া প্রতিটি সচেষ্ট মুসলিমের দায়িত্ব।

প্রচলিত জীবনবীমা ও শরিয়তের অবস্থান

প্রচলিত জীবনবীমা চুক্তিগুলোর ভিত্তি সাধারণত সুদ এবং অতিরিক্ত অনিশ্চয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। গ্রাহক নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম জমা দেন, কিন্তু তিনি কত টাকা ফেরত পাবেন বা কবে পাবেন তা অনিশ্চিত থাকে। তাছাড়া জমাকৃত অর্থ সুদি খাতে বিনিয়োগ করা হয়। এ কারণে অধিকাংশ ইসলামি ফকিহ প্রচলিত বাণিজ্যিক জীবনবীমাকে হারাম ও অবৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুদ ও অন্যায়ভাবে অন্যের ধনসম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করে বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ

‘হে ইমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে পরিচালিত ব্যবসার কথা ভিন্ন।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সব লেনদেন বা বেচাকেনা থেকে নিষেধ করেছেন যাতে ধোঁকা ও চরম অনিশ্চয়তা (গারার) বিদ্যমান। হাদিসে পাকে এসেছে—

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কঙ্কর নিক্ষেপের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় এবং অনিশ্চয়তাপূর্ণ (গারার) লেনদেন থেকে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম ১৫১৩)

জীবনবীমার টাকায় চিকিৎসা নেওয়ার শরয়ি বিধান

জীবনবীমার জমা টাকা এবং কোম্পানি থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার বিধানকে দুটিভাগে বিভক্ত করা যায়—

  • নিজের জমা প্রিমিয়ামের সমপরিমাণ টাকা: আপনি বীমা কোম্পানিতে নিজের পকেট থেকে প্রিমিয়াম বাবদ সর্বমোট যে পরিমাণ টাকা জমা দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণরূপে আপনার নিজস্ব সম্পদ। চিকিৎসায় বা অন্য কোনো প্রয়োজনে সেই পরিমাণ টাকা ব্যবহার করা শতভাগ জায়েজ।
  • জমা টাকার অতিরিক্ত বা লভ্যাংশ: আপনি যে পরিমাণ টাকা জমা দিয়েছেন, বীমা কোম্পানি যদি তার চেয়ে বেশি টাকা চিকিৎসার খরচের জন্য প্রদান করে, তবে সেই অতিরিক্ত অংশটি মূলত সুদের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ অবস্থায় এই অতিরিক্ত টাকা নিজের চিকিৎসায় বা ব্যক্তিগত ভোগে ব্যবহার করা জায়েজ নয়; বরং তা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া কোনো দরিদ্র বা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দিতে হবে।
  • চরম বাধ্যবাধকতা বা নিরুপায় পরিস্থিতি: যদি কোনো ব্যক্তি এমন মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন যে, তার কাছে নিজস্ব কোনো সঞ্চয় নেই, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও ঋণের ব্যবস্থা হচ্ছে না এবং চিকিৎসা না করালে জীবন বা অঙ্গহানির নিশ্চিত ঝুঁকি রয়েছে— তাহলে শরীয়তের বিশেষ জরুরি নিয়মে (জরুরত) কেবল ততটুকু পরিমাণ বীমার অতিরিক্ত টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করার অনুমতি মিলবে, যতটুকু না হলে জীবন রক্ষা সম্ভব নয়।

আল্লাহ তাআলা অপারগতার ক্ষেত্রে সহজতার নিয়ম বর্ণনা করে ইরশাদ করেন—

فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

‘তবে যে ব্যক্তি বাধ্য হয়— সীমা লঙ্ঘনকারী না হয়ে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ না করে— তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অত্যন্ত দয়ালু।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৭৩)

চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও, উপার্জনের পবিত্রতা রক্ষা করা আত্মিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। প্রচলিত বাণিজ্যিক জীবনবীমা থেকে দূরে থেকে ইসলামি তাকাফুল বা হালাল উপায়ে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক বীমা ব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়া উচিত। সাময়িক অসুস্থতা কাটানোর জন্য হারাম অর্থের আশ্রয় না নিয়ে, সর্বদা নিজের জমানো হালাল অর্থ দিয়েই চিকিৎসা করানো একজন মুমিনের ইমানি সততার পরিচয় বহন করে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম