সওর পর্বতে সাপের দংশন: সত্য ইতিহাস নাকি লোকমুখের গল্প?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
ছবি: জেমিনি এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের অধ্যায়টি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই ত্যাগের অনন্য মহিমায় ভাস্বর। মক্কা থেকে মদিনায় পাড়ি জমানোর সেই সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী হজরত আবু বকর (রা.) 'গারে সওর' বা সওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে এই ঐতিহাসিক অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণিত হয়েছে।
তবে এই মহান ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি গল্প মানুষের মুখে মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রচলিত আছে—গুহায় প্রবেশের পর আবু বকর (রা.) বিষধর সাপের গর্তে নিজের পা দিয়ে চেপে ধরেছিলেন এবং সাপটি তাঁকে দংশন করে। ব্যথায় চোখের জল গড়িয়ে পড়লেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরামের ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে তিনি একচুলও নড়েননি। কিন্তু ইতিহাসের কষ্টিপাথরে এই আবেগঘন কাহিনীর সত্যতা কতটুকু? চলুন, কুরআন-হাদিস ও ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে সত্যটি জেনে নেওয়া যাক।
প্রচলিত বর্ণনা ও হাদিসবিশারদদের মতামত
প্রাচীন কিছু গ্রন্থে এই সাপের দংশনের ঘটনাটি পাওয়া যায়। যেমন—ইমাম বায়হাকি (রহ.) তার ‘দালাইলুন নুবুওয়াহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, গুহায় প্রবেশের পর আবু বকর (রা.) একটি গর্তে পা রেখেছিলেন এবং ভেতরে থাকা সাপ তাকে দংশন করে। ব্যথায় তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সান্ত্বনা দেন এবং আল্লাহ সঙ্গে আছেন বলে আশ্বস্ত করেন। (বায়হাকি, দালাইলুন নুবুওয়াহ ২/৪৭৬-৪৭৭)
তবে মুহাদ্দিস ও হাদিসবিশারদদের মতে, এই বর্ণনার সনদ বা সুত্র অত্যন্ত দুর্বল (যইফ)। এর বর্ণনাধারায় এমন কিছু বর্ণনাকারী বা ‘রাবি’ রয়েছেন যাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত তার ‘আসনাল মাতালিব’ গ্রন্থে গারে সওর নিয়ে প্রচলিত এমন কিছু অতিরিক্ত ঘটনাকে ভিত্তিহীন বলে চিহ্নিত করেছেন। ফলে এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য বা সহিহ হাদিস হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
সময়ের পরিক্রমায় যুক্ত হওয়া নানান অলৌকিক কাহিনী
মূল দুর্বল গল্পটির সঙ্গে কালক্রমে লোকমুখে আরও নানান উপকথা যুক্ত হয়েছে। কোথাও গুহার গর্তগুলো সুনির্দিষ্টভাবে বন্ধ করার দীর্ঘ বিবরণ দেওয়া হয়, আবার কোথাও বলা হয়—সাপটি নাকি হাজার বছর ধরে নবীজি (সা.)-এর দিদার বা সাক্ষাতের অপেক্ষায় ছিল! এসব অতিরিক্ত কাহিনীর কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ইসলামে আবেগ বা কল্পনার চেয়ে সত্যতা ও সহিহ সনদের গুরুত্ব অনেক বেশি।
কুরআন ও হাদিসে গারে সওরের প্রমাণিত সত্য
সাপের ঘটনাটি সাময়িক প্রশ্নবিদ্ধ হলেও গারে সওরের মূল ঘটনা শতভাগ সত্য ও প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সেই পরম মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে—
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
‘যদি তোমরা তাকে (নবীকে) সাহায্য না করো, তবে স্মরণ করো—আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছিলেন তখন, যখন কাফেররা তাকে দেশান্তর করেছিল। তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয় জন, যখন তারা দুজন গুহার মধ্যে ছিল; তখন তিনি তার সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘তুমি চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ৪০)
সহিহ হাদিসেও হিজরতের এই অবিস্মরণীয় তিন রাতের কথা এসেছে। তারা যখন সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেন, তখন অনুসরণকারীরা প্রায় গুহার মুখেই পৌঁছে গিয়েছিল। আবু বকর (রা.) চিন্তিত হয়ে পড়লে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে পরম ভরসা দেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
قُلْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا فِي الْغَارِ: لَوْ أَنَّ أَحَدَهُمْ نَظَرَ تَحْتَ قَدَمَيْهِ لَأَبْصَرَنَا تَحْتَ قَدَمَيْهِ، قَالَ: مَا ظَنُّكَ يَا أَبَا بَكْرٍ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا
‘আমি গুহায় থাকা অবস্থায় নবীজি (সা.)-কে বললাম, তাদের কেউ যদি নিজ পায়ের নিচের দিকে তাকায়, তবে আমাদের দেখে ফেলবে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আবু বকর! সেই দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ?’ (বুখারি ৩৯০৫)
ইসলামের ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদা রক্ষায় আবেগের চেয়ে প্রমাণের ভিত্তি মজবুত হওয়া জরুরি। হজরত আবু বকর (রা.)-এর মহত্ত্ব কিংবা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তার ভালোবাসার গভীরতা প্রমাণের জন্য দুর্বল কোনো সাপের গল্পের প্রয়োজন পড়ে না। প্রাণ হাতে নিয়ে মহাসংকটের দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র সফরসঙ্গী হওয়া এবং নিজের সর্বস্ব দিয়ে তাকে রক্ষা করাই তার অসামান্য মর্যাদার সবচেয়ে বড় দলিল। তাই এই গল্পটি আলোচনার ক্ষেত্রে এটি যে সহিহ নয় বরং দুর্বল সূত্রে বর্ণিত, তা স্পষ্ট করা উচিত। গারে সওরের প্রকৃত শিক্ষা হলো— জীবনসন্ধিক্ষণেও রবের ওপর অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আস্থা রাখা।

