Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

শিশুরা বড়দের কাতারে দাঁড়ালে কি নামাজ নষ্ট হয়?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

শিশুরা বড়দের কাতারে দাঁড়ালে কি নামাজ নষ্ট হয়?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আমাদের সমাজের অনেক মসজিদে একটি সাধারণ দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে— ছোট কোনো শিশু বড়দের পাশে কাতারে দাঁড়ালে অনেক প্রবীণ মুসল্লি তাকে টেনে পেছনের কাতারে পাঠিয়ে দেন। অনেকের মনে এই ভুল ধারণা বাসা বেঁধেছে যে, নাবালেগ শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে নাকি পেছনের পুরো কাতারের নামাজ নষ্ট বা মাকরুহ হয়ে যায়। কিন্তু ইসলাম ও হানাফি ফিকহের আলোকে এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। শিশুর বয়স, তার বোঝার ক্ষমতা এবং মসজিদে তার চলাফেরা বা আচরণের ওপর ভিত্তি করেই ফিকহের কিতাবগুলোতে কাতার নির্ধারণের সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আসুন, বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করে কুরআন-হাদিস ও ফিকহের সুস্পষ্ট বিধানগুলো জেনে নিই—

ছোটবেলা থেকেই নামাজের প্রতি অনুরাগী করে তোলা

শিশুদের শৈশব থেকেই ইসলামের মৌলিক ইবাদত ও ভালোবাসায় গড়ে তোলা মা-বাবা ও অভিভাবকদের অন্যতম দায়িত্ব। কচি মনে ভালোবাসার আলো ছড়িয়েই তাদের মসজিদে আসার বিষয়টি অভ্যস্ত করাতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—

مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ

‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে উপনীত হলে নামাজের নির্দেশ দাও। আর তাদের বয়স দশ বছর হয়ে গেলে (নামাজ না পড়লে) নামাজের জন্য কিছুটা শাসন কর এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ ৪৯৫)

নবীজি (সা.)-এর নামাজে শিশুদের মিষ্টি উপস্থিতি

নামাজ পড়া কিংবা মসজিদে আদব শেখানোর মানে এই নয় যে শিশুমনে আতঙ্ক তৈরি করা হবে। মহানবী (সা.)-এর ইবাদতের প্রাঙ্গণেও ছিল শিশুদের প্রাণবন্ত ও মমতাময় উপস্থিতি। হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি এর উজ্জ্বল প্রমাণ—

أنَّ رَسولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ كانَ يُصَلِّي وهو حَامِلٌ أُمَامَةَ بِنْتَ زَيْنَبَ بِنْتِ رَسولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ... فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا وَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতনি উমামাহকে (কন্যা জয়নাবের মেয়ে) কোলে নেওয়া অবস্থায় নামাজ আদায় করতেন। যখন তিনি সেজদায় যেতেন, তাকে নিচে নামিয়ে রাখতেন; আর যখন দাঁড়াতেন, তাকে আবার কোলে তুলে নিতেন।’ (বুখারি ৫১৬)

এই ঘটনা স্পষ্ট করে যে, শিশু মসজিদে থাকা বা নামাজের সময় তার উপস্থিতি কোনোভাবেই নামাজের ক্ষতি, নষ্ট হওয়া, মাকরূহ হওয়া কিংবা মসজিদের পবিত্রতার পরিপন্থী নয়।

একজন শিশু হলে কাতার নির্ধারণের নিয়ম

হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাব অনুযায়ী, জামাতে যদি একটি মাত্র শিশু থাকে, তবে তাকে পেছনের কাতারে একা না দাঁড় করিয়ে বড়দের কাতারেই দাঁড় করানো ভালো। এতে অন্য কোনো মুসল্লির নামাজ বিন্দুমাত্র নষ্ট বা ত্রুটিযুক্ত হয় না। (রদ্দুল মুহতার ১/৫৭১, আল-বাহরুর রায়েক ১/৬১৮)

একাধিক শিশুর ক্ষেত্রে করণীয়

যদি একাধিক শিশু মসজিদে আসে, তবে সাধারণ নিয়ম হলো তারা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের পেছনের কাতারে আলাদাভাবে দাঁড়াবে। তবে তারা যদি সংখ্যায় একাধিক হওয়ার কারণে পেছনে শোরগোল, দুষ্টুমি বা অন্যদের নামাজে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে ফিকহবিদদের পরামর্শ হলো— তাদের আলাদা না রেখে বড়দের কাতারে অভিভাবকের পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। (রদ্দুল মুহতার ২/৭৩)

মূল উদ্দেশ্য হলো মসজিদে শৃঙ্খলা রক্ষা করা, যাতে কারো মনে বিরক্তি না আসে এবং শিশুরা একা পেয়ে খেয়ালখুশিমতো দুষ্টুমি করার সুযোগ না পায়।

অভিভাবক ও অন্যান্য মুসল্লিদের দায়িত্ব

অভিভাবকের সজাগ দৃষ্টি: শিশুকে বড়দের কাতারে দাঁড়াতে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাকে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হবে। শিশুকে মসজিদে আনার পর সে যেন ছোটাছুটি না করে, উচ্চস্বরে কথা না বলে বা অন্যকে বিরক্ত না করে—সে বিষয়ে নজর রাখা অভিভাবকের দায়িত্ব। শিশু খুব বেশি কান্নাকাটি করলে তাকে শান্ত করতে হবে, প্রয়োজনে তাকে নিয়ে সাময়িকভাবে বাইরে চলে যাওয়া উত্তম।

অন্যান্য মুসল্লিদের ধৈর্য ও স্নেহ: শিশুরা অবুঝ। কখনো তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল বা শব্দ করে ফেলতে পারে। এজন্য তাদের ধমক দেওয়া, ভয় দেখানো বা তাদের অভিভাবককে অপদস্থ করা মোটেও সুন্নাহসম্মত নয়।

নবীজি (সা.) শিশুদের কষ্টের কথা চিন্তা করে নিজের নামাজ ছোট করে দিতেন—

إِنِّي لأَقُومُ فِي الصَّلاَةِ وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَوَزَّعُ فِي صَلاَتِي كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ

‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াতাম। কিন্তু কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনলে আমি (নামাজ) সংক্ষিপ্ত করে ফেলতাম, যাতে তার মায়ের কোনো কষ্ট না হয়।’ (বুখারি ৭০৭)

শিশুকে মসজিদবিমুখ না করে ভালোবাসায় আগলে রাখুন

শিশুদের সামান্য ভুলের কারণে মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বা ভয় দেখানো হলে তারা মন মসজিদবিমুখ হয়ে পড়তে পারে। ছোটবেলা থেকেই যদি তারা ভালোবাসার আবহে মসজিদে আসার সুযোগ পায়, তবেই ভবিষ্যতে তারা দ্বীনের অনুসারী হিসেবে গড়ে উঠবে।

তাই এক বাক্যে বলতে গেলে— নাবালেগ শিশু বড়দের কাতারে দাঁড়ালে কারো নামাজ নষ্ট হয় না। একজন শিশু হলে অভিভাবকের পাশেই দাঁড়াবে, আর একাধিক হলে দুষ্টুমির আশঙ্কা থাকলে বড়দের মাঝেই জায়গা দেওয়া শরিয়তসম্মত। অভিভাবকদের দায়িত্বশীলতা এবং প্রবীণদের সহনশীল আচরণের সুন্দর সমন্বয়েই আমাদের মসজিদগুলো হয়ে উঠুক শিশুমেধা বিকাশ ও সুন্নাহ চর্চার উৎকৃষ্ট নিকেতন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম