সরকারি খরচে হজ করার শরিয়তসম্মত বিধান কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান রোকন বা স্তম্ভ। সাধারণত সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপরই হজ ফরজ করা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকার বা বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজ খরচে বা অনুদানে কিছু মানুষকে হজে পাঠিয়ে থাকে। এমতাবস্থায় সরকারি বা রাষ্ট্রীয় খরচে ফ্রি হজ করার শরিয়তি বিধান কী এবং এর মাধ্যমে ফরজ হজ আদায় হবে কি না—তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। শরিয়তের মূলনীতি ও ফকিহদের ফতোয়ার আলোকে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হলো।
সরকারি খরচে হজ আদায়ের বিধান
বাংলাদেশ সরকার বা বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ যদি তাদের বৈধ তহবিল ও শরিয়তসম্মত উপায়ে অর্জিত অর্থ থেকে কোনো নাগরিককে বিনামূল্যে হজের ব্যয় বহন করে, তবে সেই অর্থ গ্রহণ করে হজ পালন করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এর মাধ্যমে সম্পাদিত হজ শতভাগ সহিহ হবে এবং যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর অতীতে হজ ফরজ হয়ে থাকে, তবে এই হজের মাধ্যমেই তার ওপর অর্পিত ফরজ হজ (হজ্জাতুল ইসলাম) আদায় হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত ইসলামি ফতোয়া বোর্ড ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ’-এর কাছে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তারা স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন—
لَوْ أَنَّ حَاكِماً أَعْطَى بَعْضَ رَعِيَّتِهِ مَالاً وَقَالَ لَهُمْ: حُجُّوا بِهذا الْمَالِ، فَلَهُمْ أَنْ يَحُجُّوا بِهِ، وَيُجْزِئُهُمْ ذَلِكَ؛ لِعُمُومِ الأَدِلَّةِ
‘কোনো শাসক যদি তার প্রজাদের কিছু অর্থ দিয়ে বলেন, তোমরা এ অর্থ দিয়ে হজ কর— তাহলে তাদের জন্য এ অর্থ দিয়ে হজ করা জায়েজ। আর এভাবে তাদের হজও সহিহ হবে; কারণ এ ব্যাপারে সাধারণ দলিলসমূহ প্রযোজ্য।’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ফতোয়া নং ৬৫৯৩, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৬)
হজ ফরজ হওয়ার মূল শর্ত হলো সামর্থ্য বা ‘ইস্তিতাআত’। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا
‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৯৭)
এখানে নিজের উপার্জিত সম্পদ ছাড়াও যদি অন্য কোনো বৈধ উপায়ে যাতায়াত ও খরচের ব্যবস্থা হয়ে যায়, তবে শরিয়তের পরিভাষায় তিনি সামর্থ্যবান হিসেবে গণ্য হন। হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ’-তে একটি মূলনীতি উল্লেখ রয়েছে—
الْفَقِيرُ إِذَا حَجَّ مَاشِيًا ثُمَّ أَيْسَرَ لَا حَجَّ عَلَيْهِ هَكَذَا فِي فَتَاوَى قَاضِي خَانْ
‘কোনো দরিদ্র ব্যক্তি যদি পায়ে হেঁটে হজ করে, এরপর সে ধনী হয়ে যায়, তাহলে তার ওপর পুনরায় হজ ফরজ হবে না— যেমনটি 'ফাতাওয়ায়ে কাজি খান'-এ উল্লেখ আছে।’ (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৭)
এই বিধান থেকে প্রমাণিত হয় যে, ভ্রমণের সময় নিজস্ব পুঁজি বা সম্পদ না থাকলেও যদি শরিয়তসম্মত পন্থায় হজের ব্যয় সংকুলান হয়ে যায়, তবে ফরজ আদায় হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সম্পদশালী হলেও তা পুনরায় ফরজ হয় না।
সতর্কতা ও করণীয়
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক এই সুবিধার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা বজায় রাখা। সরকারি খরচে হজে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রদান করা, ঘুষের আশ্রয় নেওয়া, অবৈধ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো কিংবা অন্য কোনো যোগ্য ও গরিব ব্যক্তির প্রাপ্য অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া জায়েজ নয়। কোটা বা বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি যদি সম্পূর্ণ বৈধ ও সৎ উপায়ে হয়, তবেই কেবল তা গ্রহণ করা যাবে।
সারকথা হলো— বৈধ অর্থ, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের মাধ্যমে বিনামূল্যে হজে যাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এর মাধ্যমে বান্দার ফরজ হজ পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে যায়। তবে ইবাদতের এই পবিত্র যাত্রায় নিয়তের ইখলাস বা বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং সততার পথ অবলম্বন করা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যকীয় দায়িত্ব।

