Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিভাবকের দায়িত্ব

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৫ পিএম

সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিভাবকের দায়িত্ব

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সন্তানদের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা ও আচরণ প্রাকৃতিকভাবেই সব সময় হুবহু একরকম হয় না। কোনো সন্তান শান্ত ও বাধ্য তো অন্যজন একটু চঞ্চল হতে পারে; কেউ পড়াশোনায় তুখোড়, আবার কেউ অন্য কোনো গুণে এগিয়ে। স্বভাব, মেধা কিংবা বিশেষ প্রয়োজনের কারণে আদব-কায়দায় কিছু ফারাক দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। তবে এই পার্থক্য যেন কোনোভাবেই একপেশে পক্ষপাত বা বৈষম্যে রূপ না নেয়, সেদিকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। ইসলাম সন্তানদের লালন-পালন ও স্নেহের ক্ষেত্রে নিখুঁত ন্যায়ভিত্তিক আচরণের জোরালো শিক্ষা দেয়।

সন্তানদের মাঝে সমতা ও ন্যায়ের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাত না করার বিষয়ে হাদিসে অত্যন্ত চমৎকার ও শিক্ষণীয় একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হজরত নোমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাকে একটি উপহার বা দান দিয়েছিলেন। তখন তার মা আমরা বিনতে রাওয়াহা (রা.) বললেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী না রাখা পর্যন্ত তিনি এতে রাজি নন। তখন তার পিতা নবীজি (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে ঘটনাটি খুলে বললেন। বর্ণনায় এসেছে—

سَمِعْتُ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيْرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُوْلُ أَعْطَانِيْ أَبِيْ عَطِيَّةً فَقَالَتْ عَمْرَةُ بِنْتُ رَوَاحَةَ لَا أَرْضَى حَتَّى تُشْهِدَ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم... قَالَ أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلَدِكَ مِثْلَ هَذَا قَالَ لَا قَالَ فَاتَّقُوْا اللهَ وَاعْدِلُوْا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ

‘আমি নোমান ইবনে বাশীর (রা.)-কে মিম্বরের ওপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন আমার মাতা আমরা বিনতে রাওয়াহা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন... তিনি (নবীজি) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে ন্যায় রক্ষা কর।’ (বুখারি ২৫৮৭)

নবীজি (সা.) এই বিষয়টিকে নিছক পারিবারিক কোনো বিষয় বা সৌজন্যের মধ্যে সীমিত রাখেননি; বরং এর সঙ্গে সরাসরি তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ সন্তানদের প্রতি অন্যায় আচরণ কেবল পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরায় না, এটি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিরও একটি বড় বিষয়।

সমতা বনাম ন্যায়বিচার: যা বোঝা জরুরি

সব সন্তানকে সবকিছু আক্ষরিক অর্থে হুবহু সমান দেওয়া সবসময় সম্ভব নয় এবং শরিয়তের দৃষ্টিতেও তা অপরিহার্য নয়। এখানে সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রার্থক্যটি অনুধাবন করা খুব জরুরি—

  • প্রয়োজনভিত্তিক পার্থক্য: কোনো সন্তান অসুস্থ হলে তার চিকিৎসায় বেশি খরচ হতে পারে, কারও বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন থাকতে পারে, আবার কেউ তুলনামূলক কম খরচে চলতে পারে। প্রয়োজনের খাতিরে এই তারতম্য করা অন্যায় বা বৈষম্য নয়।
  • পক্ষপাতমূলক বঞ্চনা: অকারণে কোনো বিশেষ সন্তানকে অতিরিক্ত ভালোবেসে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা কিংবা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে দূরে রাখা মারাত্মক অন্যায়।

বৈষম্য কেবল অর্থ-সম্পদের বণ্টনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাবা-মায়ের দৈনন্দিন আচরণেও তা প্রকাশ পায়। কোনো এক সন্তানের প্রতিটি কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা অথচ অন্যজনের কথা বারবার এড়িয়ে যাওয়া, একজনের সামান্য অপরাধে কঠোর হওয়া অথচ অন্যজনের বড় ভুলও সহজে ক্ষমা করা কিংবা ছেলে ও মেয়ের মাঝে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা— সন্তানের কোমল মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সামগ্রিক জীবনের ন্যায়বিচারের সাধারণ নীতি ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন—

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সৎকর্মের নির্দেশ দেন।’ (সুরা আন-নহল: আয়াত ৯০)

সন্তানদেরকে ভালোবাসা বা স্নেহের দাঁড়িপাল্লায় একদম সমান করে মাপা হয়তো সব সময় মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না, কিন্তু তাদের প্রতি আচরণে ও অধিকারে ন্যায়পরায়ণ হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব। বাবা-মায়ের একটুখানি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তা সন্তানের মনে দীর্ঘকাল গভীর দাগ কেটে যেতে পারে। তাই পরিবারে শান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বজায় রাখতে সন্তানদের মাঝে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক সচেতন অভিভাবকের কর্তব্য।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম