অন্যের ব্যক্তিগত কথা কানে এলে করণীয় কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাশের রুম থেকে ভেসে আসা ফিসফাস, কিংবা কোনো জরুরি বৈঠকে বসে হঠাৎ করেই অন্যের ব্যক্তিগত কথা চলে আসা—এমন পরিস্থিতি মাঝেমধ্যেই তৈরি হয়। ইচ্ছা করে কেউ অন্যের কথা শুনতে চান না, তবু পারিপার্শ্বিকতার কারণে অনেক সময় তা কানে চলে আসে। ইসলামি জীবনব্যবস্থায় এই অনভিপ্রেত মুহূর্তগুলো সামলানোর জন্য অত্যন্ত চমৎকার ও মার্জিত কিছু শিষ্টাচার শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গোপনীয়তা রক্ষায় ইসলামি অনুশাসন
ইচ্ছা করে আড়ি পাতবেন না: কেউ গোপনে কথা বললে বা বুঝতে পারলে সেখানে কান পেতে শোনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছেন—
وَلَا تَجَسَّسُوا
‘তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না।’ (সুরা হুজরাত: আয়াত ১২)
হাদিসে এই কাজের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ استَمَعَ إِلَى حَدِيثِ قَوْمٍ، وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ، صُبَّ فِي أُذُنِهِ الْآنُكُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি কোনো এক দলের কথা কান পেতে শোনে, অথচ তারা তা অপছন্দ করে, কেয়ামতের দিন তার কানে গলিত সিসা ঢেলে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ৭০৪২)
অনিচ্ছায় শুনে ফেললে এড়িয়ে চলুন: হঠাৎ কোনো কথা কানে চলে এলে বিব্রত না হয়ে সেখান থেকে সশরীরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তা সম্ভব না হলে নিজের মনোযোগ অন্য কোনো দিকে সরিয়ে নিতে হবে, যাতে বাকি কথাগুলো আর মাথায় প্রবেশ না করে।
শোনা কথাটি আমানত হিসেবে লুকিয়ে রাখুন: কেউ এমনভাবে কথা বলছেন যা থেকে বোঝা যায় বিষয়টি একান্তই গোপন, তবে সেই কথা শুনে ফেললে তা অন্যের কাছে প্রকাশ করা গুরুতর অপরাধ। প্রিয়নবী (সা.) এর শিক্ষাও ঠিক এমনটাই—
إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيثِ ثُمَّ الْتَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ
‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলে এবং মুখ ঘুরায় (এদিক-সেদিক তাকায়), তখন তা আমানত।’ (আবু দাউদ ৪৮৬৮)
ব্যক্তিগত এই কথাগুলো পরবর্তীতে আর চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
কৌতূহল সংবরণ করুন: কথার সামান্য অংশ শুনেই পুরো ঘটনা জানার তীব্র কৌতূহল তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবে কে কী বলল বা এরপর কী হলো তা নিয়ে অহেতুক খোঁজখবর করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ ইসলাম সবসময় গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়।
তথ্য দিয়ে কাউকে লজ্জিত করবেন না: অন্যের কোনো দুর্বলতা বা পারিবারিক গোপনীয়তা কখনো ভুলবশত বা আকস্মিকভাবে জানা হয়ে গেলেও তা নিয়ে তাকে পরবর্তীতে খোঁটা দেওয়া বা ছোট করা যাবে না। বরং অন্যের দোষ ঢেকে রাখার চমৎকার পুরস্কারের কথা জানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।’ (মুসলিম ২৬৯৯)
গুরুতর বিপদের আশঙ্কা থাকলে দায়িত্বশীল হোন: সাধারণ গোপনীয়তার নিয়ম এখানে ব্যতিক্রম। কোনো কথার মধ্যে যদি কারো জীবন, বড় ধরনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া বা মারাত্মক অপরাধের পূর্বপরিকল্পনা টের পাওয়া যায়, তবে চুপ করে থাকা চলবে না। বরং পরিস্থিতি বুঝে বিশ্বস্ত কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিষয়টি সময়মতো জানাতে হবে।
পরিশেষে, অন্যের ব্যক্তিগত কথা কানে চলে আসা অনেক সময় মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। কিন্তু কথাটি শোনার পরের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের সংযম ও দূরদর্শিতাই ঠিক করে দেয় আমাদের নৈতিকতার মানদণ্ড। অন্যের গোপন কথা লুকিয়ে রাখা কেবল একটি তথ্য সংরক্ষণ করা নয়, বরং এটি একজন মানুষের অমূল্য সম্মান ও আত্মমর্যাদাকে নিরাপদ রাখার অনন্য ইবাদত।

