Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মুদ্রিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার শরয়ি বিধান কী?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৪ পিএম

মুদ্রিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করার শরয়ি বিধান কী?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ব্যবসা-বাণিজ্য ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় পেশা। সততা ও ইনসাফের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা পরিচালনা করলে তা যেমন দুনিয়াতে সফলতার মাধ্যম হয়, তেমনি আখেরাতেও এর জন্য রয়েছে বিরাট সওয়াব। তবে বর্তমান বাজারে অনেক সময় দেখা যায়, পণ্যের গায়ে মুদ্রিত মূল্য বা এমআরপির চেয়ে বেশি দামে তা বিক্রি করা হচ্ছে। একজন সচেতন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার মনেও প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এমআরপি ১৮ টাকার ওষুধ ২০ টাকায় বিক্রি করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না। এই বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, লাভ করার সীমা এবং ফিকহের প্রামাণ্য দলিলের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো—

ব্যবসায় লাভের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে কি?

ইসলামি শরিয়তে ব্যবসার লাভের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সর্বোচ্চ সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং যেকোনো জিনিস ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা বৈধ। তবে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলত দুটি প্রধান বিষয়ের প্রতি কঠোরভাবে খেয়াল রাখতে হবে—

১. লেনদেনে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সন্তুষ্টি আছে কি না?

২. এর মাধ্যমে কারো ওপর কোনো ধরনের জুলুম বা অত্যাচার হচ্ছে কি না?

এ বিষয়ে শরিয়তের মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘শারহুল মাজাল্লা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে—

الثمن المسمی هو الثمن الذي یسمیه و یعنیه العاقدان وقت البیع بالتراضي سواء کان مطابقًا لقیمة الحقیقیة أو ناقصًا عنها أو زائدًا علیها

‘নির্ধারিত মূল্য হলো সেই মূল্য, যা চুক্তিকারীদ্বয় পারস্পরিক সন্তুষ্টির সাথে ক্রয়-বিক্রয়ের সময় নির্ধারণ বা নির্দিষ্ট করে। সে মূল্য প্রকৃত মূল্যের সমান হোক, তার চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক।’ (শারহুল মাজাল্লা লিল-রুস্তম, পৃষ্ঠা ৭৩)

মুদ্রিত মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়ার বিধান ও জুলুমের গুনাহ

আপনি যদি কোনো পণ্য দোকান থেকে কিনে তার গায়ে মুদ্রিত দামের (MRP) চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন, তবে সেই ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেন শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং প্রাপ্ত মুনাফা মালিকের জন্য জায়েজ বলে গণ্য হবে। তবে কোম্পানির নির্ধারিত বা গায়ে লেখা মূল্যের চেয়ে বেশি নেওয়া এবং ক্রেতার ওপর বাড়তি দাম চাপিয়ে দেওয়ার কারণে একধরনের জুলুম ও প্রতারণার গুনাহ অবশ্যই হবে। কারণ, এর মাধ্যমে ভোক্তার সঙ্গে একপ্রকার অন্যায় করা হয়।

এ প্রসঙ্গে ফাতাওয়া আলমগীরীতে (হিন্দিয়া) উল্লেখ করা হয়েছে—

ومن اشتری شیئًا و أغلی في ثمنه فباعه مرابحةً علی ذلك جاز، وقال أبویوسف: إذا زاد زیادةً لایتغابن الناس فیها فإني لا أحب أن یبیعه مرابحةً حتى يبين ، و الأصل أنّ عرف التجار معتبر في بیع المرابحة

‘কেউ কোনো বস্তু বেশি দামে কিনে সেভাবে লাভ যুক্ত করে বিক্রি করলে তা জায়েজ। তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন, যদি এমন অতিরিক্ত বৃদ্ধি করা হয় যা সাধারণত মানুষ ওভারলুক করে না (বা যা অস্বাভাবিক), তবে তিনি পছন্দ করেন না যে তা না জানিয়ে লাভে বিক্রি করা হোক। আর মূলনীতি হলো, লাভজনক বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রচলিত প্রথা বা ‘উরফ’ ধর্তব্য।’ (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬১, প্রকাশনা: রশীদিয়া)

ইসলামে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ (তাসীয়ের) ও মানুষের স্বাধীনতা

ইসলাম সাধারণ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে জোরপূর্বক পণ্যের মূল্য নির্দিষ্ট করে দেওয়াকে (Taseer) সাধারণত পছন্দ করে না, যদি না বাজারে এর কোনো তীব্র সংকট বা কারসাজি থাকে। এ বিষয়ে আল্লামা শওকানী (রহ.) ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—

وَقَدِ اسْتُدِلَّ بِالْحَدِيثِ وَمَا وَرَدَ فِي مَعْنَاهُ عَلَى تَحْرِيمِ التَّسْعِيرِ وَأَنَّهُ مَظْلِمَةٌ وَوَجْهُهُ أَنَّ النَّاسَ مُسَلَّطُونَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَالتَّسْعِيرُ حَجْرٌ عَلَيْهمْ وَالْإِمَامُ مَأْمُورٌ بِرِعَايَةِ مَصْلَحَةِ الْمُسْلِمِينَ وَلَيْسَ نَظَرُهُ فِي مَصْلَحَةِ الْمُشْتَرِي بِرُخْصِ الثَّمَنِ أَوْلَى مِنْ نَظَرِهِ فِي مَصْلَحَةِ الْبَائِعِ بِتَوْفِيرِ الثَّمَنِ... وَإِلَى هَذَا ذَهَبَ جُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ

‘হাদিস এবং এর সমার্থক বর্ণনাগুলোর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জোরপূর্বক মূল্য নির্ধারণ (তাসীয়ের) করা হারাম এবং এটি একপ্রকার জুলুম। এর কারণ হলো, মানুষ নিজ নিজ সম্পদের ওপর পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী, আর মূল্য নির্ধারণ করা মানে তাদের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করা। ইমাম বা শাসক মুসলমানদের কল্যাণ সাধনে নির্দেশপ্রাপ্ত। তাই ক্রেতার কম দামে পণ্য পাওয়ার স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিক্রেতার ন্যায্য মূল্য পাওয়ার স্বার্থ রক্ষার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নয়... জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামায়ে কেরাম এই মতটিই পোষণ করেছেন।’ (নাইলুল আওতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৪৮)

তবে এর মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআনের সেই সুপরিচিত ঘোষণা, যেখানে আল্লাহ তাআলা পারস্পরিক সন্তুষ্টির শর্ত জুড়ে দিয়েছেন—

إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تراض مِنْكُمْ

‘ব্যবসা হতে হবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২৯)

সারকথা হলো, কোনো পণ্যের গায়ে এমআরপি (MRP) ১৮ টাকা লেখা থাকার পরও যদি আপনি তা ২০ টাকায় বিক্রি করেন, তবে আপনার সেই বিক্রয় চুক্তি ও অর্জিত লাভ কারিগরি বা ফিকহি বিচারে বৈধ বলে গণ্য হবে—যদি ক্রেতা জেনেশুনে সন্তুষ্টিচিত্তে সেই দামে তা কিনে থাকেন। কিন্তু কোম্পানির নির্ধারিত বা প্যাকেটের গায়ে প্রিন্ট করা মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত এবং এর মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার কারণে জুলুম ও গুনাহগার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন ও সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে সর্বদা ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা এবং গায়ে লেখা মূল্য বা সরকারের নির্ধারিত নীতি মেনে চলাটাই অধিক নিরাপদ ও বরকতময়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম