হজের জন্য জমা দেওয়া টাকার জাকাত কি দিতে হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আর্থিক ইবাদতগুলোর মধ্যে জাকাত হলো সমাজকল্যাণের এক অনন্য ভিত্তি, যা ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলে। অন্যদিকে, জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হজ পালনের প্রস্তুতিও মানুষের মনে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ জাগায়। তবে এই দুই ইবাদতের মাঝে যখন টাকার হিসাব মেলাতে হয়, তখন নানা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। হজের জন্য জমানো টাকা বা এজেন্সির কাছে জমা দেওয়া অর্থের জাকাত নিয়ে মানুষের মনে প্রায়ই কৌতূহল দেখা দেয়। চলুন, সহজ ও সাবলীল ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এ বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কী।
হজ এজেন্সির কাছে জমা দেওয়া টাকার জাকাত
হজের জন্য যে টাকা ইতিমধ্যে কোনো হজ এজেন্সিকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই টাকার জাকাত আপনাকে আদায় করতে হবে না। এর মূল কারণ হলো, আপনি এখনো হজে রওয়ানা না হলেও, টাকা জমা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে সেবা দেওয়ার শর্তে ওই অর্থের মালিকানা এজেন্সির কাছে চলে যায়। ফলে ওই নির্দিষ্ট টাকার ওপর আপনার পূর্ণ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তাই এর জাকাত আপনার ওপর ফরজ হয় না।
পক্ষান্তরে, কোনো ব্যক্তি যদি ভবিষ্যতে হজের নিয়তে নিজের কাছেই টাকা জমিয়ে রাখেন এবং সেই টাকা নেসাব পরিমাণ হয়ে এক বছর স্থায়ী হয়, তবে তাকে ওই টাকার জাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে।
জাকাতের মৌলিক ধারণা ও নেসাবের হিসাব
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো মুসলিমের কাছে শরিয়ত নির্ধারিত সীমার বেশি সম্পদ এক চন্দ্র বছর (হিজরি ১ বছর) জমা থাকলে তাকে জাকাতদাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। জাকাত মূলত বর্ধনশীল সম্পদের ওপর ফরজ হয়, যা প্রধানত চার প্রকার—
- স্বর্ণ
- রৌপ্য
- ব্যবসায়িক পণ্য
- নগদ অর্থ
কুরআনের উদ্ধৃতি—
وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ
‘তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা কর এবং জাকাত প্রদান কর।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ৪৩)
হাদিসের উদ্ধৃতি—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا
‘তাদের সম্পদ থেকে সাদকা (জাকাত) গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে।’ (সুরা তওবা: আয়াত ১০৩; বুখারি ও মুসলিম)
কারো কাছে যদি একটানা এক বছর ধরে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে— যেমন ৭ তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম বা এর বেশি স্বর্ণ, কিংবা সাড়ে ৫২ তোলা বা ৬১২.৩৫ গ্রাম রৌপ্য, অথবা এই পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্যের সমমূল্য নগদ অর্থ— তবে তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হবে। যেদিন সম্পদ নেসাব পরিমাণে পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই জাকাতের বর্ষ গণনা শুরু হবে। বছর পূর্তির দিনে মালিকানায় থাকা সমস্ত নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য ও সোনা-রূপার ২.৫ শতাংশ (চল্লিশ ভাগের এক ভাগ) জাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য হলো, বছর পূর্তির দিনে যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার কাছে থাকা সমুদয় বর্ধনশীল সম্পদেরই জাকাত দিতে হবে; কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি অংশের নয়। বছরের মাঝে বা শেষ দিকে নতুন কোনো অর্থ বা সোনা অর্জিত হলেও তা মূল হিসাবে যুক্ত হবে। তবে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জমি, বাড়ি, কিংবা আয়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত গাড়ি বা বাড়ির ওপর কোনো জাকাত নেই, কারণ এগুলো ব্যবসার পণ্য নয়।
সম্পদ মানুষের আমানত মাত্র, আর এর সঠিক ব্যবহার ও পবিত্রতা অর্জনেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি। হজের মতো পবিত্র সফরের নিয়ত যেমন বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়, তেমনি ইসলামের অন্য বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করাও মুমিনের ইমানের পরীক্ষা। তাই হজের টাকার হিসাব কিংবা জাকাতের বিধিবিধান পালনে সবসময় সচেতন থাকা উচিত, যাতে আমাদের প্রতিটি ইবাদত শরিয়তের সুনির্দিষ্ট মাপে পরিপূর্ণতা লাভ করে।

