পেছনের দিকে হাত রেখে হাঁটা কি নিষিদ্ধ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের সমাজে দৈনন্দিন চলাফেরা ও বসার নানা ভঙ্গি নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণার প্রচলন রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো— পেছন দিকে হাত দিয়ে হাঁটলে বা দাঁড়ালে শয়তানের মতো হাঁটা হয় কিংবা এটি নিষিদ্ধ। এ ধরনের কথা মানুষের মুখে মুখে শোনা গেলেও এর প্রকৃত ভিত্তি কতটুকু, তা শরিয়তের আলোকে জানা জরুরি। চলুন, কুরআন ও হাদিসের প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া যাক।
পেছন দিকে হাত দিয়ে হাঁটার প্রচলিত ধারণা ও এর সত্যতা
সাধারণত মনে করা হয় যে, পেছন দিকে হাত দিয়ে হাঁটা শয়তানের হাঁটার পদ্ধতি বা এটি নাজায়েজ। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনায় এমন তথ্য পাওয়া যায় না যে, শয়তান এভাবে হাটে। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রচলিত ভুল কথা।
কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও সরাসরি পেছন দিকে হাত দিয়ে হাঁটাকে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় বলে ঘোষণা করা হয়নি। তাই সুনির্দিষ্ট দলিলের অনুপস্থিতিতে একে সরাসরি নাজায়েজ বা শয়তানের হাঁটা বলা সঠিক নয়।
হাশরের ময়দানে আমলনামা প্রাপ্তির ভঙ্গি
তবে কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে জাহান্নামীদের যে শাস্তি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে, তার একটি দৃশ্যে তাদের আমলনামা পিঠের পেছন থেকে দেওয়া হবে বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের উদ্ধৃতি—
وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ
‘আর যাকে তার আমলনামা দেওয়া হবে তার পিঠের পেছন থেকে।’ (সুরা ইনশিকাক: আয়াত ১০)
এই ভঙ্গিটি কিয়ামতের ময়দানে অপরাধী ও জাহান্নামীদের কষ্টের অবস্থাকে প্রকাশ করে। এছাড়া কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে হাদিসে এসেছে, হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَفِي يَمِينِهِ أَمْ فِي شِمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ
‘(কঠিন বিপদের) তিনটি স্থান রয়েছে যেখানে কেউ কারো কথা স্মরণ রাখবে না এবং আমলনামা প্রাপ্তির স্থান, যখন বলা হবে, তোমাদের আমলনামা পাঠ করো— কেননা তখন সবাই পেরেশান থাকবে যে, তার আমলনামা ডান হাতে পাচ্ছে, নাকি বাম হাতে পাচ্ছে, নাকি পিছন দিক থেকে পাচ্ছে।’ (আবু দাউদ ৪৭৫৫; মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন ৮৭২২)
পেছনে হাত রেখে বসার শরঈ বিধান
হাঁটার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, পেছনে হাত রেখে তার ওপর ভর দিয়ে বসার বিষয়ে হাদিসে সতর্কতা এসেছে। সাহাবি হজরত শারিদ ইবনু সুওয়াইদ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—
مَرَّ بِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا جَالِسٌ هَكَذَا، وَقَدْ وَضَعْتُ يَدِي الْيُسْرَى خَلْفَ ظَهْرِي، وَاتَّكَأْتُ عَلَى أَلْيَةِ يَدِي فَقَالَ: أَتَقْعُدُ قَعْدَةَ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ
‘একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার নিকট দিয়ে গমন করলেন। তখন আমি এভাবে বসেছিলাম যে, আমার বাম হাত আমার পিঠের উপর ছিল এবং ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ার মাংসের উপরে আমি ভর করেছিলাম। তিনি (সা.) আমাকে এ অবস্থায় দেখে বললেন, তুমি কি এমনভাবে বসছ যেভাবে আল্লাহর অভিশপ্ত ব্যক্তিরা বসে।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৯৪৫৪, আবু দাউদ ৪৮৪৮)
মূলত এই হাদিসে পেছনে হাত রেখে তার ওপর ভর দিয়ে বসার ভঙ্গিটিকে অপছন্দনীয় ও অনুত্তম বলা হয়েছে। যেহেতু হাশরের ময়দানে জাহান্নামীদের হাত পেছনে রাখার কথা এসেছে, তাই সর্বোচ্চ এই পদ্ধতিতে হাঁটাকে ‘অনুত্তম’ বা মাকরুহ বলা যেতে পারে। কিন্তু একে সরাসরি নাজায়েজ/নিষিদ্ধ বা শয়তানের হাঁটা বলে আখ্যায়িত করা দলিলের পরিপন্থি।
কোনো বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে সমাজে নানা ধরনের অমূলক ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। পেছন দিকে হাত দিয়ে হাঁটাকে নাজায়েজ বা শয়তানের কাজ মনে করাও তেমনি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। শরিয়তে এর সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় এটিকে কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন কথা হিসেবে বর্জন করা উচিত। যেকোনো বিষয়ে কথা বলার আগে সঠিক তথ্য ও দলিল জেনে নেওয়া মুমিনের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

