স্ত্রীর মোহর দিয়ে কি শ্বশুরের ঋণ পরিশোধ করা যাবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হবু শ্বশুরের কাছে পাওনা ঋণের টাকাকেই কনের মোহর হিসেবে ধরে নিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করার চিন্তা করা। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এই পদ্ধতি কতটা বৈধ এবং সঠিক নিয়মটি কী—তা জানা অত্যন্ত জরুরি। চলুন, কুরআন ও হাদিসের প্রমাণের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া যাক।
শ্বশুরের ঋণ মওকুফকে মোহর নির্ধারণ করার বিধান
শ্বশুরের কাছে পাওনা ঋণ মওকুফ করার বিষয়টিকে কনের মোহর হিসেবে সাব্যস্ত করে বিবাহ সম্পন্ন করা জায়েজ নয়। কারণ, মোহর হলো একান্তভাবেই স্ত্রীর নিজস্ব হক বা অধিকার, যা সরাসরি স্ত্রীর প্রাপ্য। বাবার ঋণ মওকুফের বিনিময়ে তা মোহর হিসেবে চালিয়ে দিলে স্ত্রীর প্রাপ্য মোহর আদায় হবে না।
তবে এর একটি বৈধ ও সুন্দর বিকল্প রয়েছে। তা হলো—প্রথমে কনেকে তার প্রাপ্য মোহর নগদ বা অন্য কোনো উপায়ে পুরোপুরি প্রদান করতে হবে। এরপর স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেই টাকা দিয়ে তার বাবার ঋণ পরিশোধ করে দেয়, তবে এক সাথে ঋণও পরিশোধ হবে এবং স্ত্রীর মোহরও সঠিকভাবে আদায় হয়ে যাবে।
কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি ও ফিকহি দলিল
এই মাসআলার সমর্থনে শরিয়তে পবিত্র কুরআন ও প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন দলিল পেশ করা হয়েছে। নিচে সেগুলোর রেফারেন্স উল্লেখ করা হলো—
১. কুরআনের উদ্ধৃতি
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَيْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَّرِيئًا
‘আর তোমরা নারীদের তাদের মোহর হিদায়া বা উপহারস্বরূপ সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান কর। এরপর যদি তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের পক্ষ থেকে তার কিছু অংশ তোমাদের মাফ করে দেয়, তবে তা স্বাচ্ছন্দ্যে ও তৃপ্তিসহকারে ভোগ কর।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৪)
২. তাফসির গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি
وَلَمَّا كَانَ الصَّدَاقُ عَطِيَّةً مِنَ اللَّهِ تَعَالَى عَلَى النِّسَاءِ صَارَتْ فَرِيضَةً وَحَقًّا لَهُنَّ عَلَى الْأَزْوَاجِ
‘যেহেতু মোহর হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের জন্য এক ধরনের দান, তাই তা স্বামীর ওপর ফরজ ও নারীদের অধিকার হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে।’ (তাফসির মাজহারি, জাকারিয়া ২/২২১)
৩. হাদিসের উদ্ধৃতি (মোহর পরিশোধের নিয়ত সম্পর্কে)
مَنْ نَكَحَ امْرَأَةً وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُذْهِبَ بِمَهْرِهَا، فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ زَانٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি কোনো নারীকে এই নিয়তে বিবাহ করে যে সে তার মোহর পরিশোধ করবে না (বা আত্মসাৎ করবে), সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৯/৪০৬, ১৭৬৯৯; মাজমাউ আজাওয়াইদ ৪/১৩২)
৪. হাদিসের উদ্ধৃতি (সম্পদ হালাল হওয়ার শর্ত)
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ
‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিমের মাল তার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া হালাল হয় না।’ (বাইহাকি ৪/৩৮৭, ৫৪৯২)
৫. ফিকহি মূলনীতি ও ফাতাওয়া
نَفَذَ تَصَرُّفُ الْمَرْأَةِ فِي الْكُلِّ لِبَقَاءِ مِلْكِهَا
‘নারীর সম্পূর্ণ সম্পদের ওপর তার নিজের সিদ্ধান্ত বা আচরণ কার্যকর হবে, কারণ ওই সম্পদের মালিকানা একমাত্র তারই।’ (রদ্দুল মুহতার, জাকারিয়া ৪/২৩৭, করাচি ৩/১০৫)
৬. অপর একটি ফিকহি মূলনীতি
لَا يَجُوزُ لِأَحَدٍ أَنْ يَأْخُذَ مَالَ أَحَدٍ بِلَا سَبَبٍ شَرْعِيٍّ
‘কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ করা কোনো ব্যক্তির জন্যই জায়েজ নয়।’ (কাওয়ায়েদুল ফিকহ ১১০, ফাতাওয়া হিন্দা ২/১৬৭)
পারিবারিক বা লেনদেনের সহজীকরণের জন্য শরিয়তের নির্ধারিত বিধান লঙ্ঘন করা বা অন্য কারো হক অন্য খাতে ব্যবহার করা ইসলামসম্মত নয়। মোহর হলো স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার, যা তার প্রাপ্য অনুযায়ীই প্রদান করতে হবে। পরবর্তীতে স্ত্রী চাইলে নিজ ইচ্ছায় সেই অর্থ দিয়ে তার বাবার ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। তাই যেকোনো আর্থিক ও পারিবারিক বিষয়ে সঠিক শরিয়তের জ্ঞান অর্জন করে তা মেনে চলা মুমিনের দায়িত্ব।

