তাবিজ-আমলে কাউকে বশ করা প্রসঙ্গে ইসলামের বিধান কী
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
কোনো আমিল, তাবিজ কিংবা অন্য কোনো অপারগ শক্তির সাহায্যে কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করা, বশে আনা বা তার ক্ষতি করার চেষ্টা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ, হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনেক সময় জাদু বা সেহরের পর্যায়ে পড়ে।
এতে মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি ও স্বাধীন ইচ্ছার ওপর হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ঈমান ও আকিদার জন্যও মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজ মানুষকে মিথ্যা, প্রতারণা ও শিরকের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
তাই যারা এ ধরনের কাজে জড়িত, তাদের জন্য তা থেকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসা জরুরি। কবিরা গুনাহ থেকে বাঁচতে আন্তরিকভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর সংকল্প করতে হবে।
কোনো বৈধ ও শরিয়তসম্মত উদ্দেশ্য পূরণের প্রয়োজন হলে তাবিজ-আমল বা জোরপূর্বক কাউকে বশ করার পথ অনুসরণ না করে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা উচিত। তার কাছে হালাল, কল্যাণকর ও বরকতময় পথ প্রার্থনা করতে হবে। কারণ জোরপূর্বক কিংবা তাবিজ-আমলের মাধ্যমে তৈরি কোনো সম্পর্কের মধ্যে প্রকৃত সুখ ও বরকত থাকার নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে থেকে বৈধ উপায়ে সম্পর্ক ও জীবনের কল্যাণ কামনাই ইসলামের নির্দেশিত পথ।
শরঈ দলিল
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে বলেন—
وَاتَّبَعُوۡا مَا تَتۡلُوا الشَّیٰطِیۡنُ عَلٰی مُلۡکِ سُلَیۡمٰنَ ۚ وَمَا کَفَرَ سُلَیۡمٰنُ وَلٰکِنَّ الشَّیٰطِیۡنَ کَفَرُوۡا یُعَلِّمُوۡنَ النَّاسَ السِّحۡرَ ٭ وَمَاۤ اُنۡزِلَ عَلَی الۡمَلَکَیۡنِ بِبَابِلَ ہَارُوۡتَ وَمَارُوۡتَ ؕ وَمَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَکۡفُرۡؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَزَوۡجِہٖؕ وَمَا ہُمۡ بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِۚ وَیَتَعَلَّمُوۡنَ مَا یَضُرُّہُمۡ وَلَا یَنۡفَعُہُمۡؕ وَلَقَدۡ عَلِمُوۡا لَمَنِ اشۡتَرٰىہُ مَا لَہٗ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنۡ خَلَاقٍ۟ؕ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡا بِہٖۤ اَنۡفُسَہُمۡؕ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ١۰٢
বাংলায় অর্থ: তারা সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বের সময় শয়তানরা যে জাদুর কথা প্রচার করত, তার অনুসরণ করেছিল। অথচ সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরিতে লিপ্ত হয়েছিল। বাবিল শহরে হারূত ও মারূত নামের দুই ফেরেশতার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তারও অনুসরণ করা হয়েছিল। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে সতর্ক করে বলত, ‘আমরা তো পরীক্ষাস্বরূপ, সুতরাং কুফরিতে লিপ্ত হয়ো না।’ এরপরও তারা এমন জিনিস শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হতো। তবে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারত না। তারা এমন কিছু শিখত, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর, উপকারী নয়। তারা ভালোভাবেই জানত, যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করবে, আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না। তারা যে বিনিময়ে নিজেদের বিক্রি করেছে, তা কতই না মন্দ—যদি তারা তা জানত!
তাফসিরে তাওযীহুল কুরআনের ব্যাখ্যা
তাফসীরে তাওযীহুল কুরআনে বলা হয়েছে, এসব আয়াতে ইয়াহুদিদের একটি গুরুতর অপরাধের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা এমন জাদু-টোনার পেছনে ছুটেছিল, যা শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে কোনো জাদুর মন্ত্রে শিরকী বক্তব্য থাকলে তা কুফরির পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
তাফসিরে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর সময় কিছু শয়তান—যাদের মধ্যে জিন ও মানুষ উভয়ই থাকতে পারে—কিছু ইয়াহুদিকে প্ররোচিত করেছিল। তারা প্রচার করেছিল, সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজত্বের রহস্য নাকি জাদুর মধ্যে নিহিত এবং জাদু শিখলে তারাও অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। এর ফলে তারা জাদু শেখা ও তা প্রয়োগে জড়িয়ে পড়ে। অথচ জাদু শিক্ষা শুধু শরিয়তবিরোধীই ছিল না, এর কিছু পদ্ধতি কুফরির পর্যায়েও পৌঁছে যেত।
তাফসিরে ইয়াহুদিদের আরেকটি গুরুতর অপরাধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধেও অপবাদ ছড়িয়েছিল এবং তাঁকে জাদুকর হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। এমনকি তাঁর জীবনের শেষদিকে তিনি মূর্তিপূজা শুরু করেছিলেন—এমন দাবিও প্রচার করা হয়েছিল। এসব অপবাদমূলক বর্ণনা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থেও যুক্ত করা হয়েছিল বলে তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে। নাউযুবিল্লাহ।
কোরআন মাজিদের এই আয়াতে সেই অপবাদ সরাসরি খণ্ডন করা হয়েছে এবং স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) কুফরি করেননি। বরং শয়তানরাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়ে কুফরির দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
তাফসিরে আরও বলা হয়েছে, এই বক্তব্য কোরআন মাজিদের স্বাতন্ত্র্যও স্পষ্ট করে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ইয়াহুদিদের ধর্মগ্রন্থের বিষয়বস্তু জানার কোনো পার্থিব মাধ্যম ছিল না; তিনি ওহির মাধ্যমেই এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছেন। ফলে হজরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপবাদ শুধু উল্লেখই করা হয়নি, বরং তা দৃঢ়ভাবে খণ্ডনও করা হয়েছে।


