স্ত্রীর হৃদয়ে নববী ভালোবাসা, ঘরের নীরবতায় সুন্নতের সৌন্দর্য
Advertisement
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালের আলো ফোটার আগেই যে মানুষটির দিন শুরু হয় রান্নাঘরের ব্যস্ততায়, সন্ধ্যার ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরা মানুষটি কি কখনো থেমে ভেবেছেন—দিনভর এই নিরলস শ্রমের নেপথ্যে কার স্বপ্ন, কার ভালোবাসা, কার নীরব আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে?
সংসারের হিসাবের খাতায় আমরা প্রায়ই লিখে রাখি কে কী দিল, কে কতটুকু পেল। অথচ যে সম্পর্কের ভিত গড়ে ওঠার কথা ছিল মমতা ও প্রশান্তিতে, সেখানে ভালোবাসার হিসাবটুকুই যেন সবচেয়ে অনাদৃত থেকে যায়।
দাম্পত্য নিয়ে আমাদের অধিকাংশ আলাপ ঘুরেফিরে অধিকার, কর্তব্য আর প্রাপ্যতার বৃত্তেই আবর্তিত হয়। কে কতটা দায়িত্ব পালন করলেন, কার প্রতি কার কতটা দায়—এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এরও আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—যে মানুষটির সঙ্গে জীবন ভাগ করে নিয়েছি, তার কাছে আমি কতটা আশ্রয়, কতটা প্রশান্তি?
ইসলাম দাম্পত্যের সূচনা করেছে কেবল বিধিবদ্ধ চুক্তির মাধ্যমে নয়; বরং ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির এক অনুপম দর্শনে। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রূমের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি মানুষের মধ্য থেকেই তাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে। আর তাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।
আয়াতটির শেষাংশে ব্যবহৃত দুটি শব্দ ‘মাওয়াদ্দাহ’ ও ‘রহমাহ’ দাম্পত্যের গভীরতাকে যেন এক বাক্যে ধারণ করে। ভালোবাসা এখানে কেবল অনুভূতি নয়, আর দয়া কেবল অনুগ্রহ নয়; বরং একে অপরের জীবনে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও মমতার অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি।
সূরা আল-বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের পোশাক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পোশাক যেমন আবৃত করে, সুরক্ষা দেয়, সৌন্দর্য বাড়ায় এবং নৈকট্যের অনুভূতি জাগায়, দাম্পত্যও তেমনই হওয়া প্রত্যাশিত।
যে সম্পর্কে মানুষ নিজের দুর্বলতা আড়াল করতে পারে, ক্লান্তি নামিয়ে রাখতে পারে, ভুলের পরও ফিরে আসার আশ্রয় খুঁজে পায়—সেই সম্পর্কই তো পোশাকের উপমাকে সার্থক করে।
সূরা আন-নিসার ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ—‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ আর সূরা আল-বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াত জানিয়ে দেয়, নারীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন রয়েছে তাদের ওপর দায়িত্ব। অর্থাৎ দাম্পত্যে অধিকার একমুখী কোনো সড়ক নয়; এটি পারস্পরিক মর্যাদা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের এক যৌথ পথচলা।
কুরআনের এই আদর্শকে নবীজি (সা.) তার জীবনে রূপ দিয়েছেন। তার কাছে একজন মানুষের উত্তম হওয়ার পরীক্ষা কেবল জনসমক্ষে, মসজিদের কাতারে কিংবা বক্তব্যের মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল ঘর—যেখানে মানুষ মুখোশহীন, যেখানে আচরণের প্রকৃত রূপটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জামে আত-তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে, মুমিনদের মধ্যে পূর্ণতম ঈমানের অধিকারী সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর; আর উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীদের প্রতি উত্তম।
একই মর্মের বর্ণনা তিরমিজি ও ইবনে মাজাহয়ও এসেছে—তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। নবীজি (সা.) বলেছেন, তিনি তার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।
এই নববী ঘোষণা আমাদের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচন করে—মানুষের নৈতিক সৌন্দর্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচয় অনেক সময় তার ঘরের মানুষগুলোই দিতে পারেন।
আরও পড়ুন
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে নবীজি (সা.) নারীদের প্রতি কল্যাণের উপদেশ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য কোনো স্বভাবে সে সন্তুষ্ট হতে পারে।
মানুষের অপূর্ণতাকে অস্বীকার না করে তার ভেতরের ভালো দিকগুলোকে স্বীকার করার এ শিক্ষা দাম্পত্যের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সংসার নিখুঁত দুজন মানুষের মিলন নয়; বরং অপূর্ণ দুজন মানুষের পরস্পরকে বুঝে নেওয়ার দীর্ঘ সাধনা।
নবীজির নিজের জীবনেও ভালোবাসার প্রকাশ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, অকৃত্রিম ও মর্যাদাপূর্ণ। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) যখন জানতে চাইলেন, মানুষের মধ্যে নবীজি (সা.)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে, তিনি বললেন—‘আয়িশা।’
ভালোবাসার কথা প্রকাশ্যে বলতে তিনি সংকোচ করেননি। সহিহ মুসলিমে খাদিজা (রা.)-এর প্রতি তার ভালোবাসার কথাও বর্ণিত হয়েছে। খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও তার স্মৃতি, তার প্রতি নবীজির অনুরাগ এবং তার পরিচিতজনদের প্রতি সম্মান সেই ভালোবাসার গভীরতাকেই প্রকাশ করে।
ভালোবাসা তার কাছে কেবল আবেগের উচ্চারণ ছিল না; ছিল একসঙ্গে সময় কাটানো, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং প্রিয় মানুষের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বাস্তব চর্চা। আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহতে আয়িশা (রা.)-এর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর দৌড় প্রতিযোগিতার বর্ণনা এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, উম্মতের দায়িত্ব ও ইবাদতের ব্যস্ততার মাঝেও প্রিয়তম স্ত্রীর সঙ্গে এমন আনন্দময় মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া তার পারিবারিক জীবনের এক কোমল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
সহিহ বুখারিতে আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) ঘরে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন। এই একটি বর্ণনাই ঘরের কাজ, পুরুষের মর্যাদা এবং সুন্নতের প্রকৃত অর্থ নিয়ে আমাদের বহু প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। পরিবারের কাজে হাত লাগানো তার কাছে মর্যাদার ঘাটতি ছিল না; বরং দায়িত্বশীল জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল।
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় করা সম্পদেও সওয়াব রয়েছে, এমনকি স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া লোকমাটিতেও। সংসারের যে ছোট্ট কাজকে আমরা কখনো তুচ্ছ ভাবি, নিয়ত ও ভালোবাসার স্পর্শে সেটিও আল্লাহর কাছে প্রতিদানের উপলক্ষ হতে পারে।
একটি লোকমা, এক কাপ পানি, ক্লান্ত মুখে একটু স্বস্তির কথা—এসবের মধ্যেও যে ইবাদতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, নববী শিক্ষা আমাদের সেই দৃষ্টিই দেয়।
দাম্পত্যের সৌন্দর্য ভালোবাসার মায়ায়, তার পবিত্রতা নববী আদর্শের ছায়ায়, আর তার স্থায়িত্ব একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতায়।
ইসলামের প্রাচীন আলেমরাও দাম্পত্যের এই সৌন্দর্যকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ইবনে কাসির সূরা আন-নিসার ১৯ নম্বর আয়াতের তাফসিরে স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণের ব্যাখ্যায় উত্তম কথা ও সুন্দর আচরণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
ইমাম গাজালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন-এর বিবাহ অধ্যায়ে দাম্পত্যের আদব, কোমলতা, পারস্পরিক সহনশীলতা ও হৃদ্যতার নানা দিক আলোচনা করেছেন। ইবনুল কাইয়িম যাদুল মাআদ-এ নবীজি (সা.)-এর পারিবারিক জীবন ও আচরণের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।
এসব আলোচনা স্মরণ করিয়ে দেয়, উত্তম দাম্পত্য কেবল অন্যকে কষ্ট না দেওয়ার নাম নয়; বরং তার মনকে বুঝতে চেষ্টা করা, অভিমানকে অবজ্ঞা না করা এবং সম্পর্কের ভেতর সৌজন্য ও স্নেহকে বাঁচিয়ে রাখারও নাম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন ‘মুআশারা বিল মারুফ’ কেবল নৈতিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি শরিয়তের নির্দেশিত দায়িত্ব। অন্যদিকে, হৃদয়ের অনুভূতি সব সময় মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু সেই অনুভূতির অজুহাতে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা, অসম্মান করা কিংবা জুলুম করা বৈধ হয়ে যায় না।
আবু দাউদে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়সংগত বণ্টনের বিষয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন এবং অন্তরের যে বিষয় তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সে বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
এ শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়—হৃদয়ের টান সমান না-ও হতে পারে, কিন্তু আচরণে ন্যায়, মর্যাদা ও দায়িত্বশীলতা রক্ষা করা মানুষের কর্তব্য।
অথচ আমাদের চারপাশের দাম্পত্য-বাস্তবতা কখনো কখনো এই নববী আদর্শ থেকে বহু দূরে সরে যায়। কোথাও স্ত্রীর গায়ে হাত ওঠে, কোথাও তার মতামতকে তুচ্ছ করা হয়, কোথাও ঘরের কাজে সহযোগিতা করাকে পুরুষের মর্যাদাহানি মনে করা হয়, কোথাও অপমানকে ‘শাসন’ আর অবহেলাকে ‘অধিকার’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
ধর্মের নাম উচ্চারিত হয়, অথচ ধর্মের শেখানো কোমলতা, ন্যায় ও দায়িত্ববোধ অনুপস্থিত থাকে।
যে নবীজি (সা.) পরিবারের কাজে হাত লাগিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন, ভালোবাসার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন এবং পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড করেছেন—তার সুন্নতের অনুসারী হওয়ার দাবি নিয়ে ঘরে ফিরে যদি কেউ অহংকার, অবজ্ঞা কিংবা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেন, তবে তাকে নিজের সুন্নত-চর্চার অর্থ নতুন করে ভেবে দেখতে হবে।
সুন্নত শুধু বাহ্যিক অবয়বের নাম নয়, সুন্নত আচরণেরও নাম। দাড়ি, টুপি কিংবা পোশাকের মতো বাহ্যিক অনুশীলনের গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা যায়, ঘরের ভেতর মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি, সেটিও নববী আদর্শ অনুসরণের এক অপরিহার্য ক্ষেত্র।
স্ত্রীর কথা মন দিয়ে শোনা, তার শ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া, অসুস্থতায় পাশে থাকা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, তার মতামতকে মর্যাদা দেওয়া—এসব কোনো আধুনিকতার আমদানি নয়; বরং সদাচরণ ও উত্তম চরিত্রেরই বাস্তব প্রকাশ।
সংসারকে নিখুঁত করে তোলে না বড় বড় প্রতিশ্রুতি; তাকে সুন্দর করে তোলে প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ। কখনো একটুখানি সহযোগিতা, কখনো ক্লান্ত মুখে একটি কোমল বাক্য, কখনো নীরব কষ্টের পাশে নির্ভরতার হাত।
দাম্পত্যের ভালোবাসা তাই কেবল বিশেষ দিনের আয়োজন নয়; প্রতিদিনের দায়িত্ব, সংযম, কৃতজ্ঞতা ও মমতার মধ্য দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
পবিত্র কুরআন দাম্পত্যকে যে ‘মাওয়াদ্দাহ’ ও ‘রহমাহ’-এর বন্ধনে দেখতে চেয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক আমাদের ঘরের প্রতিটি আচরণে। নবীজি (সা.) আমাদের সামনে মাপকাঠি রেখে গেছেন—উত্তম মানুষ সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।
সেই মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার করতে গেলে প্রশ্নটি খুব সরল, অথচ গভীর—বাইরের পৃথিবী আমাকে যেমনই চিনুক, আমার ঘরের মানুষটি আমাকে কীভাবে চেনেন?
কারণ, মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য অনেক সময় কোনো মঞ্চে উচ্চারিত হয় না, তা নীরবে লেখা থাকে ঘরের ভেতর প্রিয় মানুষের হৃদয়ে।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

