কালিমা শুদ্ধ করে বলতে না পারলে কি নিজেকে মুসলমান দাবি করা যাবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
কালিমা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা মাতৃভাষা ছাড়া আরবি শুদ্ধভাবে উচ্চারণ বা পড়তে পারেন না। এমনকি প্রতিদিনের ইমানি উচ্চারণ ‘কালিমায়ে শাহাদত’ও হয়তো তাদের পুরোপুরি সহিহ হয় না। তবে তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি রয়েছে অবিচল বিশ্বাস এবং দ্বীন ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসা। এ অবস্থায় অনেক সময় তাদের মনে বড় সংশয় তৈরি হয়— অশুদ্ধ উচ্চারণের কারণে কি তাদের ইমান বাতিল হয়ে যাবে? তারা কি নিজেকে পরম শ্রদ্ধায় ‘মুসলমান’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন? ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, সুসংহত ও মমতাময় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইমানের আসল ভিত্তি ও শরিয়তের বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি অন্তর থেকে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদে একনিষ্ঠ বিশ্বাস রাখেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর বান্দা, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসেবে মুখে স্বীকার করেন এবং দ্বীনের মৌলিক ও অকাট্য বিষয়গুলোতে আস্থা রাখেন, তবে তিনি নিঃসন্দেহে একজন মুসলমান।
আরবি ভাষা শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে না পারা কিংবা কালিমায়ে শাহাদতের তিলওয়াত সহিহ না হওয়ার কারণে কেউ কখনোই ইসলাম থেকে খারিজ বা বের হয়ে যাবেন না।
ইসলামের মৌলিক ভিত্তি প্রকাশ করে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
‘ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত দেওয়া, হজ করা এবং রমজানের রোজা রাখা।’ (বুখারি ৮)
আলেমদের মতামত ও ফিকহশাস্ত্রের দলিল
ইসলামি আকাইদের বিখ্যাত আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈমানের মূল স্থান হলো অন্তর বা হৃদয়। অন্তরের বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকারোক্তিই একজন মানুষকে মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত করে।
আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ
وَالإِيمَانُ هُوَ الإِقْرَارُ بِاللِّسَانِ وَالتَّصْدِيقُ بِالْجَنَانِ، وَأَنَّ جَمِيعَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِي الْقُرْآنِ وَجَمِيعَ مَا صَحَّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الشَّرْعِ وَالْبَيَانِ كُلُّهُ حَقٌّ
‘ঈমান হলো মুখে স্বীকার করা এবং অন্তরে সত্য বলে বিশ্বাস করা। আর আল্লাহ তাআলা কুরআনে যা কিছু নাজিল করেছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শরিয়ত ও ব্যাখ্যার বিষয়ে যা সহিহভাবে প্রমাণিত হয়েছে— সবকিছুই সত্য বলে মানা। (আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৪-১৫)
শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ
إِنَّ الإِيمَانَ فِي الشَّرْعِ: هُوَ التَّصْدِيقُ بِمَا جَاءَ بِهِ النَّبِيُّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ تَعَالَى أَيْ تَصْدِيقُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْقَلْبِ فِي جَمِيعِ مَا عُلِمَ بِالضَّرُورَةِ مَجِيئُهُ بِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ تَعَالَى إِجْمَالاً ... وَالإِقْرَارُ بِهِ أَيْ بِاللِّسَانِ
‘শরিয়তের পরিভাষায় ইমান হলো—নবী (সা.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, সেগুলোকে অন্তর দিয়ে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং মুখে তা স্বীকার করে নেওয়া।’ (শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৩)
আল-ইমানু বাইনাস সালাফি ওয়াল মুতাকাল্লিমিন (আল-ফিকহুল আকবরের ব্যাখ্যা)
فَمَنْ صَدَّقَ بِقَلْبِهِ، وَلَمْ يُقِرَّ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مُؤْمِنًا فِي أَحْكَامِ الدُّنْيَا، وَمَنْ أَقَرَّ بِلِسَانِهِ، وَلَمْ يُصَدِّقْ بِقَلْبِهِ كَالْمُنَافِقِ فَهُوَ بِالْعَكْسِ
‘অধিকাংশ গবেষক আলেমের মতে, ইমান হলো মূলতঃ অন্তরের তাসদিক বা বিশ্বাস। পার্থিব জীবনের বিচার-আচারের জন্য মৌখিক স্বীকৃতি শর্ত মাত্র। সুতরাং যে অন্তরে বিশ্বাস করেছে, সে আল্লাহর কাছে মুমিন।’ (আল-ইমানু বাইনাস সালাফি ওয়াল মুতাকাল্লিমিন, পৃষ্ঠা ৯৮)
আল-ফিকহুল আকবর
أَصْلُ التَّوْحِيدِ وَمَا يَصِحُّ الاعْتِقَادُ عَلَيْهِ يَجِبُ أَنْ يَقُولَ: آمَنْتُ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى وَالْحِسَابِ وَالْمِيزَانِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَذَلِكَ كُلُّهُ حَقٌّ
‘তাওহিদ ও ইমানের মূল ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস ব্যক্ত করা যে— আমি বিশ্বাস আনলাম আল্লাহ, তার ফেরেশতা, তার কিতাবসমূহ, তার রাসুলগণ, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, তাকদিরের ভালো-মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়া, হিসাব, মিজান এবং জান্নাত ও জাহান্নামের ওপর— এসবই সত্য।’ (আল-ফিকহুল আকবর, পৃষ্ঠা ৫/১৩)
ভুল উচ্চারণে ইমান ঠিক থাকলেও শেখার চেষ্টা করা আবশ্যক
অশুদ্ধ উচ্চারণে ইমান বাতিল না হলেও, একজন সচেতন মুমিনের জন্য সারাজীবন কালিমায়ে শাহাদত বা কুরআন মাজিদ ভুল পড়ে যাওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। যেটুকু না শিখলেই নয়, সেটুকু ইলম অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ। কুরআন-হাদিসের আলোকে আলেমরা ফতোয়া দিয়েছেন যে, ইবাদত সঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় দ্বীনি ইলম শেখা আবশ্যক।
রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়ায়ে শামী)
مِنْ فَرَائِضِ الإِسْلاَمِ تَعَلُّمُهُ مَا يَحْتَاجُ إِلَيْهِ الْعَبْدُ فِي إِقَامَةِ دِينِهِ وَإِخْلاَصِ عَمَلِهِ لِلَّهِ تَعَالَى ... وَفَرْضٌ عَلَى كُلِّ مُكَلَّفٍ وَمُكَلَّفَةٍ بَعْدَ تَعَلُّمِهِ عِلْمَ الدِّينِ وَالْهِدَايَةِ تَعَلُّمُ عِلْمِ الْوُضُوءِ وَالْغُسْلِ وَالصَّلاَةِ وَالصَّوْمِ
‘ইসলামের অন্যতম ফরজ হলো বান্দার দ্বীন পালন, আল্লাহর জন্য আমল খাঁটি করা এবং মানুষের সঙ্গে চলার জন্য প্রয়োজনীয় ইলম শিক্ষা করা। দ্বীন ও হেদায়েতের মৌলিক বিশ্বাসের পর প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর ওপর অজু, গোসল, নামাজ ও রোজার প্রয়োজনীয় বিধান শেখা ফরজ।’ (রদ্দুল মুহতার, দারুল ফিকর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২)
কাজেই কালিমায়ে শাহাদত, প্রয়োজনীয় সুরা ও নামাজের দোয়া-কালাম সহিহ ও শুদ্ধভাবে শেখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যায়, শুদ্ধ আরবি বলতে না পারলেও অন্তরের অবিচল ইমানের কারণে আপনি অবশ্যই মুসলমান। তবে এ অজুহাতে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে নিজের ইমানি উচ্চারণ ও তিলওয়াতকে সুন্দর করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মহান আল্লাহ বান্দার নিয়ত ও চেষ্টার মূল্যায়ন করেন। আসুন, আমরা অলসতা ছেড়ে আজ থেকেই কালিমা ও প্রয়োজনীয় কুরআন তিলওয়াত শুদ্ধ করার মেহনত শুরু করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার ইমানকে কবুল করুন। আমিন।

