দোয়ার সময় আল্লাহর কাছে কোন নাম দিয়ে কী চাইবেন?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমরা যখন মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলি, তখন সাধারণত নিজেদের অভাব, দুঃখ আর প্রয়োজনের কথাই বেশি তুলে ধরি। তবে আমদের চাওয়া বা দোয়ার আগে—আমরা কার কাছে চাচ্ছি, তার পরিচয় ও মহান গুণাবলী স্মরণ করা দোয়ার অন্যতম আদব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তার সুন্দর সুন্দর নাম ধরে তাকে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আল্লাহর গুণবাচক নাম স্মরণ করে দোয়া করলে অন্তরে আশা, ভরসা ও বিনয় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا
‘আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সেসব নামেই ডাকো।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ১৮০)
আল্লাহর এই সুন্দর নামগুলোকে ‘আসমাউল হুসনা’ বলা হয়। দোয়ার সময় এ নামগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে ডাকলে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।
আল্লাহর সুন্দর নাম ও কুরআনিক নির্দেশনা
জীবনের একেকটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ভিন্ন ভিন্ন গুণবাচক নাম স্মরণ করে আমাদের প্রার্থনা করা উচিত—
১. রিজিক ও বরকত চাইলে— ‘আর-রাজ্জাক’ (الرَّزَّاقُ)
জীবিকায় টানাটানি বা হালাল রিজিকের প্রয়োজনে আল্লাহর (الرَّزَّاقُ) ‘আর-রাজ্জাক’ (যিনি পরম রিজিকদাতা) নামটি স্মরণ করে দোয়া করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা আয-যারিয়াত: আয়াত ৫৮)
২. পাপমোচন ও ক্ষমা চাইলে— ‘আল-গাফুর’ (الْغَفُورُ)
ভুল বা গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর (الْغَفُورُ) ‘আল-গাফুর’ (অতীব ক্ষমাশীল) নাম ধরে ক্ষমা ও ইস্তেগফার করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَىٰ
‘আর আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি, যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকাজ করে এবং সৎপথে অবিচল থাকে।’ (সুরা ত্বহা: আয়াত ৮২)
৩. বিপদ ও কঠিন পরিস্থিতিতে— ‘আল-লতিফ’ (اللَّطِيفُ)
সংকটময় সময়ে আল্লাহর সূক্ষ্ম মেহেরবানি ও অদৃশ্যের দয়া পেতে তার (اللَّطِيفُ) ‘আল-লতিফ’ (অতি সূক্ষ্ম অনুগ্রহকারী ও পরম কোমল) নামটি স্মরণ করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اَللّٰهُ لَطِیۡفٌۢ بِعِبَادِهٖ یَرۡزُقُ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَ هُوَ الۡقَوِیُّ الۡعَزِیۡزُ
‘আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অতি দয়ালু। তিনি যাকে ইচ্ছা রিজিক দান করেন। আর তিনি মহাশক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী।’
৪. দ্রুত দোয়া কবুলের প্রত্যাশায়— ‘আল-মুজিব’ (الْمُجِيبُ)
আল্লাহ আমাদের ডাক শোনেন এবং সাড়া দেন— এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে (الْمُجِيبُ) ‘আল-মুজিব’ (যিনি ডাকে সাড়া দেন) নাম স্মরণ করে আকুতি জানানো উচিত। কুরআনে হজরত সালেহ (আ.) তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন—
إِنَّ رَبِّي قَرِيبٌ مُّجِيبٌ
‘নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতি নিকটবর্তী এবং দোয়া কবুলকারী।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬১)
৫. আল্লাহর ভালোবাসা পেতে— ‘আল-ওয়াদুদ’ (الْوَدُودُ)
আল্লাহর সন্তুষ্টি, অনুকম্পা ও ভালোবাসা পেতে তার (الْوَدُودُ) ‘আল-ওয়াদুদ’ (পরম ভালোবাসাময়) নাম স্মরণ করে দোয়া করা সুন্দর। আল্লাহ বলেন—
وَهُوَ الْغَفُورُ الْوَدُودُ
‘আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, ভালোবাসাময়।’ (সুরা আল-বুরুজ: আয়াত ১৪)
৬. বারবার ভুল হলে তওবার জন্য— ‘আত-তাওয়াব’ (التَّوَّابُ)
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বারংবার ভুল হলেও নিরাশ না হয়ে (التَّوَّابُ) ‘আত-তাওয়াব’ (বারবার তাওবা কবুলকারী) নাম ধরে রবের দিকে ফিরে আসা প্রয়োজন। হজরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন—
فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
‘অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী পেলেন। ফলে তিনি তার তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৩৭)
৭. কঠিন সংকটে সাহায্যের জন্য— ‘আল-হাইয়্যু, আল-কাইয়্যুম’ (الْحَيُّ الْقَيُّومُ)
জীবনের যেকোনো বড় জটিলতায় (الْحَيُّ) ‘আল-হাইয়্যু’ (চিরঞ্জীব) ও (الْقَيُّومُ) ‘আল-কাইয়্যুম’ (সবকিছুর ধারক ও পরিচালক) বলে আল্লাহর কাছে শক্তি ও সুরাহা প্রার্থনা করা সুন্নত। আল্লাহ ঘোষণা করেন—
اللَّهُ لا إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ
‘আল্লাহ! তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা বিদ্যমান।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৫৫)
৮. ‘ইসমে আজম’ ও আসমাউল হুসনার বিশাল ফজিলত
হাদিসে আল্লাহর মহান নামসমূহকে ‘ইসমে আজম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা ফেরত দেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে দোয়ায় ‘ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কায়্যুম’ এবং অন্য এক বর্ণনায় ‘আল-আহাদুস সামাদ’ উচ্চারণ করতে শুনে বলেছিলেন যে, লোকটি আল্লাহর ইসমে আজম বা মহান নামের মাধ্যমে দোয়া করেছে, যা দ্বারা প্রার্থনা করলে আল্লাহ অবশ্যই সাড়া দেন।’ (নাসাঈ ১৩০০, তিরমিজি ৩৫৪৪, আবু দাউদ ১৪৯৩)
এছাড়াও আল্লাহর নামসমূহ আয়ত্ত করার পরম ফজিলত বর্ণনা করে প্রিয় নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلاَّ وَاحِدًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
‘আল্লাহ তাআলার নিরানব্বইটি—অর্থাৎ এক কম একশতটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলো আয়ত্ত করবে (অর্থ বুঝবে, বিশ্বাস রাখবে ও তদানুযায়ী আমল করবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি ২৭৩৬, মুসলিম ২৬৭৭)
দোয়ার মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে বান্দার অন্তরের বিনয় ও বিশ্বাসের গভীরে। আমরা কী চাচ্ছি তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কার কাছে হাঁটু গেড়ে চাচ্ছি তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, আমরা যখনই পরম করুণাময়ের দরবারে দুহাত তুলব, তখন তার উপযুক্ত গুণবাচক সুন্দর নামগুলো ধরে চোখের পানি ফেলে নিজের সমস্ত আকুতি ও অভাব তুলে ধরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার নামের যথার্থ অসিলা দিয়ে দোয়া করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

