Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

সন্তান লালন-পালনে বাবা-মাকে ৩ অনুরোধ শায়খ আহমাদুল্লাহর

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

সন্তান লালন-পালনে বাবা-মাকে ৩ অনুরোধ শায়খ আহমাদুল্লাহর

শায়খ আহমাদুল্লাহ

Advertisement

আজকের যুগের বাচ্চারা বোধ হয় আমাদের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতিত। শৈশবে আমরা গ্রামে মুক্ত বাতাসে যেভাবে বড় হয়েছি, এরা তার ছিটেফোঁটাও পাচ্ছে না। আমরা তখন এত চকলেট বা হরেক রকমের খাবার চোখেও দেখিনি; একটা মোয়া হাতে পেলেই আমাদের আনন্দ ধরে রাখতে পারতাম না, একটা চকলেট পেলেই লাফিয়ে উঠতাম। অথচ এত প্রাচুর্য না থাকলেও আমরা তাদের চেয়ে অনেক বেশি সুখে ও শান্তিতে ছিলাম।

মনে পড়ে, গ্রামের সেই টিনের ঘরের কথা। মা ভোরে ঘরের দরজা খুলতেন, আর সেই দরজা বন্ধ হতো রাতে ঘুমানোর সময়—৯টা কি ১০টায়। এর মধ্যে দরজা বন্ধ করার কোনো বালাই ছিল না। যতবার খুশি উঠানে যেতাম, পাশের ঘরে যেতাম, বাইরে ছুটে বেড়াতাম।

কিন্তু এখনকার দৃশ্য সম্পূর্ণ উল্টো। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দেখি, ছোট্ট বাচ্চাটা আব্বুর সঙ্গে যাওয়ার জন্য চিৎকার করে কাঁদছে। মা তাকে টেনে ধরে আটকে রাখছেন। বাবা-মা দুজনে মিলে জোর করে তাকে ঘরে আটকে মুখের ওপর দরজাটা লাগিয়ে দিচ্ছেন। এই টানাটানির ফলে শিশুটির মনে একধরনের গভীর মানসিক ট্রমা ও স্ট্রেস তৈরি হয়। সে তখন নিজেকে কোনো জেলখানার কয়েদি ভাবে। বারান্দা থেকে শুধু তাকিয়ে দেখে, তার বাবা চলে যাচ্ছে আর সে ঘরের ভেতর বন্দি!

ভাবুন তো, এসব শিশুর চেয়ে আমরা কতটা সুখে আর রিলাক্সে ছিলাম! শুধু হাতে একটা ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দিলেই তো বাচ্চার আসল বেঁচে থাকা নিশ্চিত হয় না। তাদের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিনোদন, খেলাধুলার সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের সময়।

ঢাকা শহরে হয়তো ফ্ল্যাট সংস্কৃতির কারণে বাচ্চাদের মাঠে নিয়ে গিয়ে খেলাধুলা করানোর সুযোগ খুব বেশি নেই। কিন্তু ঘরের ভেতরেও তো বাচ্চার সঙ্গে খেলা করা যায়। অথচ বেশিরভাগ পরিবারেই এই চর্চাটা দেখা যায় না।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কারীমে স্পষ্ট বলেছেন—আমাদের সম্পদ এবং সন্তান উভয়ই আমাদের জন্য এক ধরনের পরীক্ষা। কিন্তু আমরা মনে করি, সন্তানকে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেই বুঝি দায়িত্ব শেষ। আমাদের অনেকের মধ্যেই এই অলীক ভাবনা কাজ করে যে, প্রিন্সিপাল বা হুজুরদের কাছে এমন কোনো জাদুকরী ওষুধ আছে, যা খাইয়ে দিলেই বাচ্চা এক দিনে হাফেজ, আলেম বা আদর্শ মানুষ হয়ে যাবে! এই ভুল মানসিকতার কারণে বাসাবাড়িতে সন্তানকে মানুষ করার পেছনে বাবা-মায়ের যে নিজস্ব প্রচেষ্টা থাকা দরকার, তার দেখা মেলে না বললেই চলে।

অথচ মহান আল্লাহ আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও।’ তাই আমাদের ব্যস্ত জীবনের প্রধান অংশ হওয়া উচিত পরিবারকে সময় দেওয়া।

আমি নিজে সবসময় আমার বাচ্চাদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। কিছুদিন আগে নির্বাচনের পর আমার সন্তানের শিক্ষক যখন আমাদের বাসায় এলেন, তখন তিনি দেখলেন আমি বাচ্চাদের সঙ্গে খোশমেজাজে ব্যাডমিন্টন খেলছি। আমরা বাসায় সবাই মিলে এক দস্তরখানে, এক প্লেটে খাবার খাই। আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী তিনজনের, পাঁচজনের বা সাতজনের ভিন্ন সাইজের প্লেট রয়েছে। একসঙ্গে বসে খাওয়ার এই আনন্দটাই আলাদা।

সন্তানদের সময় দেওয়া কতটা জরুরি, তা হয়তো আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না। আমি সাধারণত বাসা থেকেই অফিসের কাজ বা হোম অফিস করার চেষ্টা করি। খুব বেশি জরুরি মিটিং বা অতিথি না থাকলে সপ্তাহে বড় জোর এক বা দুই দিন বাইরে যাই। বাকি দিনগুলোতে ঘরে থেকেই কাজ করি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো— কাছ থেকে বাচ্চাদের দেখভাল করা, তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানো।

বাবা-ছেলেরা মিলে আমরা নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় করি। নফল রোজা থাকলে সবাই মিলে একসঙ্গে রোজা রাখি এবং এক স্নিগ্ধ পরিবেশে ইফতার করি।

আমাদের সন্তানদের যদি সত্যিই ভালো মানুষ ও দ্বীনমুখী করতে হয়, তবে তাদের মোবাইল ও স্ক্রিন আসক্তি থেকে রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই। ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে না পারলে তাকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।

আমার একটি প্রোগ্রামের কথাই ধরা যাক। এক নারী লিখিত প্রশ্ন করে জানালেন— তার সন্তান মোবাইল ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না। যখনই তিনি ফোনটা কেড়ে নিতে যান, তখন উল্টো তার সন্তান তাকে ধমক দিয়ে বলে— ‘তোমার প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন করার শিক্ষাটাই হয়নি, তাই তুমি আমাকে মোবাইল ছাড়তে বলছ। তোমার প্যারেন্টিংয়েই ত্রুটি আছে!’

আমি তাঁকে স্পষ্ট করে বলেছি, সন্তানরা মুখে যা শোনে, তার চেয়ে চোখে যা দেখে—তা থেকে অনেক বেশি শেখে। আপনি নিজে সারাদিন সোফায় বসে ফেবু বা ইউটিউবে ডুবে থাকবেন, আর মুখে বলবেন ‘বাবা, মোবাইল ধরতে হয় না’—তাহলে সন্তান কোনোদিন আপনার কথা শুনবে না। সন্তানের সামনে আগে নিজের মোবাইল টেপার অভ্যাস ছাড়তে হবে। আপনি যখন নিজে ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থেকে সন্তানকে বলবেন পড়তে বসতে, তখন সে মনে করবে সব সুখ বুঝি ওই মোবাইলেই আছে, আর মা জেনেশুনেই তাকে তা থেকে বঞ্চিত করছে। এই আক্রোশ থেকেই সে সুযোগ পেলেই চুরি করে মোবাইল হাতে নেবে।

আজকের যুগে মোবাইলের নেশা থেকে মুক্ত এমন বাচ্চা খুঁজে পাওয়া সত্যিই এক কঠিন ব্যাপার।

তাই বাবা-মায়েদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ তিনটি—

১. সন্তানদের প্রচুর সময় দিন

বাসাবাড়িতে কখনোই অফিস, আদালত, রাজনীতি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের মানসিকতা বা চাপ নিয়ে ঢুকবেন না। ঘরের বাইরেই ওগুলো ফেলে আসুন। ঘরে প্রবেশ করে বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করুন, তাদের কথা শুনুন, একসঙ্গে খেতে বসুন। মোবাইল ফোন দূরে সরিয়ে রেখে পূর্ণ মনযোগ দিন তাদের দিকে।

২. নিজের ডিভাইস ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন

বাচ্চাদের ডিভাইস থেকে বাঁচাতে চাইলে আগে নিজের আসক্তি কমান। প্রয়োজনের কাজটুকু শেষ করে মোবাইল একপাশে রেখে দিন। নিজে সারাদিন স্ক্রিনে ডুবে থেকে সন্তানকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। আমি নিজে অনেক বড় বড় মিটিংয়ের মধ্যেও বাচ্চাদের সঙ্গে খেলার সময় হলে মিটিং শেষ করে দিই। কারণ আমার কাছে আমার সন্তানদের চেয়ে বড় কোনো মিটিং বা কাজ থাকতে পারে না। আমার সন্তানই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাসেট এবং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

৩. চার দেওয়ালের বন্দিদশা ভাঙুন

আজকের বাচ্চারা সত্যি সবচেয়ে নির্যাতিত। গ্রামে যেভাবে আমরা মুক্ত বাতাসে বড় হয়েছি, ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালে তারা তা থেকে বঞ্চিত। তাই তাদের পর্যাপ্ত খেলাধুলা, মানসিক আনন্দ ও শান্তির পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদেরই।

আধ্যাত্মিক সুরক্ষার বিষয়টিও ভুললে চলবে না

আমাদের সন্তানরা কেবল মানসিকভাবে নয়, আধ্যাত্মিক দিক থেকেও আজ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। বদনজর কিংবা দুষ্ট জিনের প্রভাবে জর্জরিত নয়—এমন বাচ্চা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম বড় কারণ হলো আমাদের বাসাবাড়িতে বেহিসাব মিউজিক বা গানের চর্চা। আমরা হয়তো সচেতনভাবে গান শুনি না, কিন্তু ইউটিউবে কোনো শিক্ষামূলক ভিডিও চালালেও ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বেজে ওঠে। শয়তানের সঙ্গে কানেক্ট হওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো এই মিউজিক, যা মানুষকে নিজের অজান্তেই ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

এর থেকে বাঁচতে হলে ঘরে কুরআন তেলাওয়াতের পরিবেশ বাড়াতে হবে, সব ধরনের মিউজিক এবং প্রাণীর ছবি টাঙানো বন্ধ করতে হবে এবং পুরোপুরি সুন্নাহর মডেলে ঘর পরিচালনা করতে হবে।

আমাদের সন্তানদের জন্য নিয়মিত আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হবে, যেন তারা আমাদের চক্ষু শীতলকারী হয় এবং মুত্তাকীদের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে ওঠে। সমাজজুড়ে আজ যে কিশোর গ্যাং ও যুবসমাজ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে, তা থেকে রক্ষা পেতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সুদৃঢ় ইসলামি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাবা-মায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং মহান আল্লাহর রহমতের মাধ্যমেই কেবল আমাদের এই অমূল্য ধনগুলোকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম