আল্লাহর নামে কসম করে তা ভাঙলে সত্যিই কি গর্ভের সন্তানের ক্ষতি হয়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় গর্ভবতী মায়েদের নানা ধরণের অযৌক্তিক ভীতি ও দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। তেমনই একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো— গর্ভাবস্থায় আল্লাহর নামে কোনো কসম বা শপথ করে তা ভাঙলে নাকি গর্ভের সন্তানের ক্ষতি হয় কিংবা সন্তান বিকলাঙ্গ হয় বা বিপদে পড়ে। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। কসম রক্ষার সঙ্গে সন্তান বা অন্য কারও ক্ষতি হওয়ার কোনো শরয়ি বা বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। গর্ভাবস্থায় কসম রক্ষা বা ভঙ্গের মূল বিধান এবং এর সঠিক কাফফারা সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কসম ভঙ্গে গর্ভের সন্তানের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি?
গর্ভবতী নারী যদি আল্লাহর নামে কোনো কসম করার পর তা ভেঙে ফেলেন, তবে এতে তার গর্ভের সন্তানের কোনোপ্রকার শারীরিক, মানসিক বা আত্মিক ক্ষতি হয় না। ইসলামে একজনের অপরাধ বা দায়িত্ব অন্য কারও ওপর চাপানো হয় না। গর্ভাবস্থায় কৃত কসমের বিধান অন্যান্য যেকোনো সময়ের সাধারণ কসমের মতোই।
কসম রক্ষা ও ভঙ্গের শরয়ি বিধান
গর্ভাবস্থায় বা অন্য যেকোনো সময়ে কসম করলে প্রথমত তা যদি কোনো ভালো ও কল্যাণকর বিষয়ে হয়, তবে কসম রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা আবশ্যক।
তবে কসমকৃত কাজটি যদি অকল্যাণকর হয় কিংবা কসমের বিপরীত কাজটিই অধিক উত্তম ও কল্যাণকর মনে হয়, তবে সেক্ষেত্রে কসম ভেঙে ফেলে ভালো কাজটি করাই ইসলামের নির্দেশ এবং এজন্য নির্ধারিত কাফফারা আদায় করতে হবে। এছাড়া কাজটি কল্যাণকর হওয়া সত্ত্বেও যদি বাধ্য হয়ে কসম রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, তবুও কসম ভঙ্গের নিয়ম অনুযায়ী কাফফারা আদায় করে নিতে হবে।
কসম ভঙ্গের কাফফারা
কসম ভেঙে গেলে শরিয়াহ নির্ধারিত কাফফারা আদায় করা বাধ্যতামূলক। কসমের কাফফারা হলো তিনটি উপায়ের যেকোনো একটি নির্বাচন করা—
- ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক দরিদ্র বা মিসকীন ব্যক্তিকে দুই বেলা তৃপ্তি সহকারে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো (অথবা খাবারের সমপরিমাণ নগদ টাকা দান করা)।
- ১০ জন দরিদ্র ব্যক্তিকে এক জোড়া করে ব্যবহারযোগ্য পরিধেয় বস্ত্র প্রদান করা।
- একজন দাস বা দাসী মুক্ত করা (যা বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক)।
যদি কোনো ব্যক্তির উপরোক্ত উপায়ে কাফফারা আদায় করার আর্থিক সামর্থ্য বা ক্ষমতা না থাকে, তবে তাকে ধারাবাহিক/লাগতার ৩টি রোজা রাখতে হবে।
কুরআন থেকে উদ্ধৃতি
কসমের কাফফারা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়েছেন—
الَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
‘আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হলো দশজন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা নিজেদের পরিবারকে খাইয়ে থাকো, অথবা তাদের বস্ত্র দান করা, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। আর যে এর সামর্থ্য রাখে না, তার জন্য তিন দিন রোজা রাখা।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৮৯)
হাদিস থেকে উদ্ধৃতি
কসমের বিপরীত কাজটি কল্যাণকর হলে কসম ভেঙে কাফফারা দেওয়া উত্তম—এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنِّي وَاللَّهِ إِنْ شَاءَ اللَّهُ لاَ أَحْلِفُ عَلَى يَمِينٍ، فَأَرَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا، إِلاَّ كَفَّرْتُ عَنْ يَمِينِي، وَأَتَيْتُ الَّذِي هُوَ خَيْرٌ
‘আল্লাহর কসম! ইনশাআল্লাহ, আমি কোনো বিষয়ে কসম করার পর যদি তার চেয়ে ভিন্ন অন্য কোনো বিষয়কে অধিক উত্তম বা কল্যাণকর মনে করি, তবে আমি অবশ্যই আমার কসমের কাফফারা আদায় করি এবং যেটি উত্তম সেটিই সম্পন্ন করি।’ (বুখারি ৬৬২৫, মুসলিম ১৬৪৯)
অতএব, গর্ভাবস্থায় কোনো কসম ভেঙে গেলে গর্ভের সন্তানের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হবে—এই ধরনের লোকমুখের কুসংস্কার বা কাল্পনিক ভীতি মনে না রেখে ইসলামি বিধান অনুযায়ী কসমের কাফফারা আদায় করে নেওয়া উচিত। অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ভুলবশত কসম ভেঙে গেলে নির্দিষ্ট কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে শরিয়তের অনুসরণ করাই একজন ইমানদারের দায়িত্ব।

