যে কারণে জান্নাতের সুসংবাদ দিতে বাধা দিয়েছিলেন ওমর (রা.)
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নবী করিম (সা.)-এর সান্নিধ্য ও সাহাবিদের সুগভীর প্রজ্ঞা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ইসলামের সোনালী ইতিহাস। অনেক সময় বাহ্যিকভাবে কোনো সাহাবির পদক্ষেপে কঠোরতা মনে হলেও, তার পেছনে থাকত উম্মাহর কল্যাণ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এবং হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে আমরা তাওহিদ (একত্ববাদ) ও দৈনন্দিন আমলের এক অসাধারণ ভারসাম্য দেখতে পাই। ঘটনাটি কেবল ইমানের আনন্দের নয়, বরং দায়িত্বশীল আমলি জীবনের গুরুত্বও আমাদের অনুধাবন করায়।
১. মদিনার মজলিস ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপস্থিতি
মদিনার এক সুন্দর দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ঘিরে বসে ছিলেন তার প্রাণপ্রিয় সাহাবিরা। সেই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং হজরত আবু হুরাইরা (রা.)-এর মতো মহান ব্যক্তিবর্গ। নবীজির সান্নিধ্যে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল জ্ঞান, ভালোবাসা ও ইমানের ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত।
এমন সময় হঠাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.) মজলিস থেকে উঠে কোনো এক কাজে বাইরে গেলেন। কিন্তু বেশ দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি ফিরে এলেন না। প্রিয় নবীকে দেখতে না পেয়ে সাহাবিদের মনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দানা বাঁধল— কোথাও কোনো শত্রু তার ক্ষতি করে ফেলেনি তো? এই চিন্তায় অস্থির হয়ে সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্ধানে চারিদিকে বেরিয়ে পড়লেন।
২. হজরত আবু হুরাইরার (রা.) ভালোবাসার সন্ধান
খুঁজতে খুঁজতে হজরত আবু হুরাইরা (রা.) আনসারদের বনু নাজ্জার গোত্রের একটি দেয়ালঘেরা বাগানের কাছে এসে পৌঁছালেন। কিন্তু চারপাশে ঘুরেও বাগানে প্রবেশের মতো কোনো দরজা তিনি পেলেন না। তখন তার চোখে পড়ল বাইরের এক কুপ থেকে আসা একটি অতি সরু নালা বা জলধারা প্রাচীরের তলদেশ দিয়ে বাগানের ভেতরে ঢুকেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আবু হুরাইরা (রা.) নিজেকে সংকুচিত করে কোনোমতে সেই সরু পথ দিয়েই বাগানের ভেতরে প্রবেশ করলেন।
বাগানের ভেতরে ঢুকেই তিনি দেখলেন— রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে নিরাপদে বসে আছেন! প্রিয় নবীকে অক্ষত দেখে তার হৃদয়ে স্বস্তির ঢেউ খেলে গেল; কষ্ট, ভয় ও সব ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল। তিনি নবীজিকে (সা.) জানালেন যে, তার অনুপস্থিতিতে সাহাবিরা কতটা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
৩. ঐতিহাসিক সুসংবাদ ও অনন্য স্মারক
রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু হুরাইরা (রা.)-এর অন্তরের আকুলতা দেখে তাকে এক মহান সুসংবাদ দিলেন। তিনি তার নিজের জুতা জোড়া আবু হুরাইরার (রা.) হাতে দিয়ে বললেন—
‘তুমি আমার এই জুতা জোড়া নিয়ে যাও। বাগানের বাইরে যার সঙ্গেই তোমার দেখা হবে, আর সে যদি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ সাক্ষ্য দেয় যে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই’, তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ জানিয়ে দাও।’
৪. হজরত ওমরের (রা.) বাধা ও প্রতিক্রিয়া
নবীজির (সা.) জুতা হাতে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত মনে আবু হুরাইরা (রা.) বাগান থেকে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু বের হতেই তার দেখা হয়ে গেল হজরত ওমরের (রা.) সঙ্গে। হজরত ওমর (রা.) তার হাতে জুতা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আবু হুরাইরা, তোমার হাতে এগুলো কী?’
আবু হুরাইরা (রা.) বললেন, ‘এগুলো রাসুলুল্লাহর (সা.) জুতা। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি অন্তরের পরম বিশ্বাসে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সাক্ষ্য দেবে, তাকে যেন জান্নাতের সুসংবাদ দিই।’
কথাটি শোনামাত্রই দূরদর্শী ওমর (রা.) আবু হুরাইরা (রা.)-এর বুকে হাত দিয়ে একটি ধাক্কা দিলেন, যাতে আবু হুরাইরা (রা.) মাটিতে পড়ে যান। ওমর (রা.) বললেন, ‘তুমি ফিরে যাও!’
ঘটনাটিতে ব্যথিত ও অশ্রুসজল চোখে আবু হুরাইরা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ফিরে এলেন। পেছনে পেছনে ওমরও (রা.) এসে পৌঁছালেন। নবীজি (সা.) আবু হুরাইরাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ তিনি বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললেন।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) ওমরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওমর! তুমি এমনটি কেন করলে?’
ওমর (রা.) বিনীতভাবে নিজের অন্তরের গভীর আশঙ্কার কথা প্রকাশ করে বললেন— ‘হে আল্লাহর রাসুল! বাবা-মা আপনার ওপর উৎসর্গ হোক, আপনি কি আবু হুরাইরাকে এই সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’
ওমর (রা.) তখন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এমনটি করবেন না। আমার আশঙ্কা হয়, মানুষ যদি কেবল এই সুসংবাদের ওপরই ভরসা করে বসে থাকে, তবে তারা নেক আমল করা ছেড়ে দেবে। তাই তাদের আমল করতে দিন।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) ওমরের (রা.) প্রজ্ঞা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা উপলব্ধি করে বললেন, ‘তাহলে তাদের আমল করতেই দাও।’
হাদিস থেকে উদ্ধৃতি
সম্পূর্ণ ঘটনাটি হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ মুসলিমে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: ... فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اذْهَبْ بِنَعْلَيَّ هَاتَيْنِ، فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ، فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ» ... فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَلَا تَفْعَلْ، فَإِنِّي أَخْشَى أَنْ يَتَّكِلَ النَّاسُ عَلَيْهَا، فَخَلِّهِمْ يَعْمَلُونَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَخَلِّهِمْ»
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘তুমি আমার এই জুতা জোড়া নিয়ে যাও। এই দেয়ালের বাইরে যার সঙ্গেই তোমার দেখা হবে এবং যে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ সাক্ষ্য দেবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। ... (এরপর ঘটনা শেষে) ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এমন করবেন না, কারণ আমি ভয় পাচ্ছি যে মানুষ শুধু এর ওপরই নির্ভর করে বসে থাকবে। সুতরাং তাদের আমল করতে দিন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাহলে তাদের (আমল করতে) ছেড়ে দাও।’ (মুসলিম ৩১)
কুরআন থেকে উদ্ধৃতি
শুধু মুখে ইমানের স্বীকারোক্তি নয়, বরং জান্নাত লাভের জন্য যে সৎকর্ম ও আমল অপরিহার্য তা পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষিত হয়েছে—
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
‘আর যারা ইমান এনেছে এবং সৎকাজ (আমলে সালেহ) করেছে, আপনি তাদেরকে সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৫)
এই ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
- তাওহিদ ও আমলের সামঞ্জস্য: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হলো ইসলামের মূল ভিত্তি বা চাবিকাঠি। তবে সেই চাবিকাঠি দিয়ে জান্নাতের দরজা খুলতে হলে সৎকাজের মাধ্যমে তাতে খাঁজ কাটতে হয়।
- হজরত ওমরের (রা.) প্রজ্ঞা ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শন: ওমর (রা.) তাওহিদের মহিমাকে ছোট করেননি, বরং তিনি সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতেন। তিনি জানতেন, মানুষ কেবল ক্ষমার সুসংবাদ শুনলে অলস হয়ে পড়তে পারে এবং নামাজ, রোজা ও মানুষের হক আদায়ের মতো মৌলিক ফরজ আমলগুলো অবহেলা করতে পারে।
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদারতা ও পরামর্শ গ্রহণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের যুক্তিপূর্ণ কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং উম্মাহর কল্যাণে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ওমরের (রা.) সুদূরপ্রসারী চিন্তা বুঝতে পেরে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নেন।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কেবল মুখের একটি বাক্য নয়, এটি জীবন দর্শন ও আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি। এই প্রতিশ্রুতি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের কথা, কাজ ও ব্যবহারে প্রকাশ পায়। হজরত ওমরের (রা.) সেই আশঙ্কার কথা আজও আমাদের জন্য ভীষণ প্রাসঙ্গিক। জান্নাতের আশা অবশ্যই আমাদের বুকে থাকবে, কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নিরলস নেক আমল, নৈতিকতা ও পরহেজগারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে খাঁটি ইমানের পাশাপাশি নিয়মিত সৎকর্ম বা নেক আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

