রাগ নয়, যে আমলে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর জন্ম হয় মুহূর্তের উত্তেজনায়। আমরা যখন রেগে যাই, তখন মনের ওপর বিবেকের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রেগে গেলে আমরা এমন অনেক কথা অনায়াসে বলে ফেলি, যা সাধারণ অবস্থায় হয়তো ভাবতেও পারি না। ঝগড়া থেমে যায়, সময় বয়ে যায়, রাগ উঠে যাওয়া মানুষটি হয়তো তার বলা কটূ কথাগুলো ভুলেও যায়। কিন্তু যার বুকে সেই কথার তীর এসে বিঁধেছিল, সেই ক্ষতের যন্ত্রণা সে বয়ে বেড়ায় দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।
শরীরে আঘাত লাগলে রক্ত ঝরে, ব্যান্ডেজ বাঁধলে ক্ষত শুকিয়ে যায়। কিন্তু মুখের কথার আঘাত কোনো চোখে দেখা যায় না। অপমান, সামর্থ্য নিয়ে খোঁটা বা ব্যক্তিগত দুর্বলতায় আঘাত করে বলা কথাগুলো মনের গহীনে স্থায়ী দাগ কেটে দেয়। একটিমাত্র কটু কথার ক্ষত এত গভীর হয় যে, সামান্য একটা ‘সরি’ বা ‘রাগের মাথায় বলে ফেলেছি’ অজুহাত সেই ভাঙা মনকে জোড়া লাগাতে পারে না। ইসলাম এই সত্যকে খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাই মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি হিসেবে রাগকে অস্বীকার না করলেও, রাগের সময়ে মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে।
রাগ দমনই তো আসল বীরত্ব
আমরা অনেকেই ভাবি, রাগের মাথায় চিৎকার করা বা অন্যকে কথায় হারিয়ে দেওয়া হয়তো নিজের শক্তির প্রকাশ। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শক্তির সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংজ্ঞা দিয়েছেন।
الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে আছড়ে ফেলে; বরং প্রকৃত বীর তো সেই ব্যক্তি, যে রাগের মুহূর্তে নিজেকে সামলে রাখতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সেসব মানুষের প্রশংসা করেছেন, যারা মনের ভেতরের এই উত্তাল আগুনকে বুকের মধ্যে চেপে রাখতে পারে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়—
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা সচ্ছলতায় ও অভাবে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, যারা রাগ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়; নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
এমনকি নবী ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনেও আমরা এর দারুণ এক শিক্ষা পাই। যখন তার নিজের পিতা তাকে পাথর মেরে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন, তখনো তিনি উত্তেজিত হননি। পরম মমতায় ও শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন—
قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ
‘তিনি (ইবরাহিম) বললেন, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ (সুরা মরিয়ম: আয়াত ৪৭)
কুরআনের অন্য আয়াতেও রাগ সংবরণ করা ও ক্ষমা করে দেওয়াকে প্রকৃত বিশ্বাসীদের অন্যতম সেরা গুণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ اِذَا مَا غَضِبُوۡا هُمۡ یَغۡفِرُوۡنَ
‘আর যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।’ (সুরা শুরা: আয়াত ৩৭)
যখন রাগ চেপে বসবে: শান্তির ৫টি দাওয়াই
রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কথা বলা মানেই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। তাই রাগ উঠলে প্রিয় নবীজি (সা.) আমাদের কিছু বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উপায় শিখিয়ে গেছেন—
১. মুখে তালা দিন, নীরব থাকুন
কারো কথায় কষ্ট পেলেও রাগের মুহূর্তে পাল্টা জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। নবীজি (সা.) বলেছেন—
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ
‘তোমাদের কেউ যখন ক্রুদ্ধ হবে, সে যেন নীরব থাকে।’ (মুসনাদে আহমদ ৬৯৩)
২. শরীরের অবস্থান বদলে ফেলুন
রাগের সময় দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন, আর বসে থাকলে শুয়ে পড়ুন। এতে শরীরের উত্তেজনা অনেকটাই কমে আসে। নবীজি (সা.) বলেছেন—
إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ
‘তোমাদের কারো যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগের উদ্রেক হয় তাহলে সে যেন বসে পড়ে। এতে যদি তার রাগ দূর হয় তো ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (আবু দাউদ ৪৭৮২)
৩. শয়তান থেকে আশ্রয় চান
ঝগড়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে দেখে বলেছিলেন, সে যদি একটি বাক্য পড়ে তবে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। সেই বাক্যটি হলো—
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
‘আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (বুখারি ৩২৮২)
আল্লাহ তাআলা কুরআনেও বলেছেন—
وَ اِمَّا یَنۡزَغَنَّكَ مِنَ الشَّیۡطٰنِ نَزۡغٌ فَاسۡتَعِذۡ بِاللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
‘আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আরাফ: আয়াত ২০০)
৪. মন শান্ত হলে ভালোবাসায় কথা বলুন
কথা বলা জরুরি হলে রাগ পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। মেজাজ শান্ত হলে নিজের কষ্টের কথাটি বুঝিয়ে বলুন, এতে ভুল বোঝাবুঝি মিটে যায়।
৫. অহংকার ভুলে ক্ষমা চেয়ে নিন
যদি ভুলবশত কাউকে কটু কথা বলেই ফেলেন, তবে অহংকার পাশে সরিয়ে রেখে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নিন। এতে মনের ক্ষত হয়তো রাতারাতি মিটবে না, তবে সম্পর্কের ভাঙন রোধ হবে।
মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার শিক্ষা
নবীজি (সা.) কীভাবে রাগ সামলাতেন, তার একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বর্ণিত আছে বুখারি শরিফে। একবার এক বেদুইন এসে রাসুল (সা.)-এর চাদর ধরে এত জোরে টান দিল যে, তার মোলায়েম ঘাড়ে চাদরের লাল দাগ বসে গেল। লোকটির আচরণ ছিল ভীষণ রুক্ষ। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.) একটুও না রেগে, তার দিকে তাকিয়ে কেবল মিষ্টি একটি হাঁসি দিলেন এবং তাকে তার চাহিদামতো দান করার নির্দেশ দিলেন।
এক সাহাবি যখন এসে আর্জি জানালেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাকে সংক্ষেপে কিছু উপদেশ দিন।’ নবীজি (সা.) বারবার কেবল একটি কথাই বললেন—
لاَ تَغْضَبْ
‘তুমি রাগ কোরো না।’ (বুখারি: ৬১১৬)
সর্বোপরি, আমাদের কথার লাগাম ধরে রাখার বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এই চিরন্তন নসিহতটি মনে রাখা চাই—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের (কিয়ামতের) প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি ৬০১৮)
ঝড়ের মেঘ কেটে গেলে আকাশ যেমন আবার পরিষ্কার হয়ে যায়, রাগও একসময় কেটে যায়। কিন্তু রাগের ঝড়ে যে গাছগুলো ভেঙে পড়ে, সেগুলো আর আগের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আমাদের মুখের একটি বিষাক্ত বাক্য বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ভালোবাসার সম্পর্ককে মুহূর্তে ছাই করে দিতে পারে। তাই আসুন, জিহ্বাকে সংযত রাখি। কথা বলার আগে একটু থামি, ভাবি। কথা দিয়ে মন জয় করা না গেলেও, অন্তত নীরব থেকে কারো মন ভাঙা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।

