অন্তরে প্রতিহিংসা জন্মালে তা থেকে আত্মরক্ষার উপায় কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অন্যের সাফল্য, অফুরন্ত সম্পদ, মনকাড়া সৌন্দর্য কিংবা যেকোনো অনন্য নিয়ামত দেখে মানুষের মনে মাঝেমধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এটি মানুষের মনের এক সূক্ষ্ম দুর্বলতা। তবে এই অনুভূতি যখন অতিমাত্রায় রূপ নিয়ে এমন এক আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয় যে, ‘অন্যের সেই নিয়ামতটি নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যাক’—তখনই তা হয়ে ওঠে ‘হিংসা’ বা ‘হাসাদ’। ইসলাম অন্তরের এই মারণব্যাধি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। কারণ এই এক হিংসা মানুষের সারাজীবনের অর্জিত ভালো কাজগুলোকে মুহূর্তেই ছাই করে দিতে পারে।
মুখের হাসির পেছনে অন্তরের শত্রুতা বা হিংসা কোনো বিশ্বাসী মানুষের পরিচয় হতে পারে না। শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে যেমন আমরা কত কসরত করি, ঠিক তেমনি অন্তরের এই বিষাক্ত কীট থেকে নিজের আত্মাকে পবিত্র রাখা অতীব জরুরি। ইসলাম কেবল এই ক্ষতিকর প্রবণতার সতর্কবার্তাই দেয়নি, বরং কীভাবে মনের ভেতরের এই বিষাক্ত হিংসার আগুন নেভানো যায়, তারও সুন্দর প্রতিষেধক ও মানবিক পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
১. হিংসামুক্ত জীবন গঠনের স্পষ্ট নির্দেশ
কারো ভালো সহ্য করতে না পারা এবং মনে মনে তার ক্ষতি কামনা করা অন্তরের এক চরম ব্যাধি। হিংসা মানুষে মানুষে ভাইয়ে ভাইয়ে দূরত্ব তৈরি করে। এ বিষয়ে সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَحَاسَدُوا وَلاَ تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخْوَانًا
‘তোমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ কর না, হিংসা কর না এবং একে অপরের পেছনে শত্রুতা কর না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে একে অপরের ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি ৬০৬৫)
২. নিজের নিয়ামতের দিকে তাকান ও শুকরিয়া আদায় করুন
অন্যের প্রাপ্তিকে নিজের বঞ্চনা ভাবলেই মনে অসন্তোষ ও হিংসার জন্ম নেয়। আপনি যদি সবসময় আপনার ওপরের মানুষদের ধন-সম্পদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে নিজের পাওয়া অগণিত নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে হবে। এজন্য নজর দিতে হবে নিচের দিকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মনস্তাত্ত্বিক দাওয়াই দিয়ে বলেছেন—
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلاَ تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لاَ تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ
‘তোমরা নিজেদের চেয়ে নিচের অবস্থানের মানুষের দিকে তাকাও, ওপরের দিকে তাকাইও না। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে না করার মানসিকতা তৈরি হবে।’ (মুসলিম ২৯৬৩)
৩. যার প্রতি হিংসা জাগে, তার জন্য প্রাণভরে দোয়া করুন
কারো উন্নতি দেখে অন্তরে হিংসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তার ক্ষতি কামনা না করে, উল্টো তার কল্যাণের জন্য প্রাণভরে দোয়া করে দিন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এক দারুণ দোয়ার শিক্ষা দিয়েছেন—
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
উচ্চারণ: ‘রব্বানাগফিরলানা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাজিনা সাবাকুনা বিলইমানি ওয়া লা তাঝআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল লিল্লাজিনা আমানু রব্বানা ইন্নাকা রায়ুফুর রাহিম।’
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওই ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।’ (সুরা হাশর: আয়াত ১০)
৪. নিজের জন্য যা পছন্দ করেন, ভাইয়ের জন্যও তা চান
হিংসার মূল প্রতিষেধক হলো অপরের শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়া। নিজেকে প্রশ্ন করুন— নিজের জন্য যে সাফল্য আর সুখ আমি চাই, আমার ভাইয়ের জন্য কি তা চাইতে পারছি? মুমিন হওয়ার মাপকাঠি বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন—
لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি ১৩)
৫. হিংসা হলো নেক আমল পুড়িয়ে দেওয়ার আগুন
যেমন করে শুকনো কাঠে আগুন লাগলে নিমেষেই সব ছাই হয়ে যায়, হিংসাও মানুষের সারা জীবনের কষ্টার্জিত ভালো কাজগুলোকে ঠিক সেভাবেই ধ্বংস করে দেয়। প্রিয় নবী (সা.) এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন—
إِيَّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنَّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الْحَطَبَ
‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা মানুষের সৎ কাজগুলোকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে (ধ্বংস করে), যেমন আগুন কাঠকে বা ঘাসকে খেয়ে ফেলে।’ (আবু দাউদ ৪৯০৩)
৬. হিংসুকের ক্ষতি থেকে আল্লাহর দরবারে আশ্রয়
হিংসা এতটাই মারাত্মক যে, অন্যের হিংসুটে নজর ও চক্রান্ত থেকে বাঁচতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
‘এবং আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক: আয়াত ৫)
অন্তরে হিংসা জাগলে তাৎক্ষণিক করণীয়
অনুভূতি চেপে বসতে দেবেন না: হিংসার চিন্তা মাথায় আসামাত্র তা প্রশ্রয় না দিয়ে মনে মনে তওবা ও ইস্তেগফার করুন—
اَسْتَغْفِرُ الله
উচ্চারণ: ‘আসতাগফিরুল্লাহ।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হন: অন্যের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহ আপনাকে যতটুকু দিয়েছেন, তার জন্য মন থেকে বলুন—
اَلْحَمْدُ لله
উচ্চারণ: ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
অর্থ: ‘সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য।’
গোপনে তার জন্য দোয়া করুন: যার প্রতি হিংসা হচ্ছে, তার বরকত ও কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলুন। ফেরেশতারা আপনার জন্যও অনুরূপ দোয়া করবেন। যে দোয়া শিখিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ—
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
উচ্চারণ: ‘রব্বানাগফিরলানা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাজিনা সাবাকুনা বিলইমানি ওয়া লা তাঝআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল লিল্লাজিনা আমানু রব্বানা ইন্নাকা রায়ুফুর রাহিম।’
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের ওই ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।’ (সুরা হাশর: আয়াত ১০)
অন্যের আলো কেড়ে নিলে নিজের ঘরে কখনো আলো জ্বলে না। অন্যের নিয়ামত দেখে জ্বলেপুড়ে ছারখার হওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না; বরং তা নিজের আত্মাকে তিল তিল করে ধ্বংস করার নামান্তর। মনের ভেতর হিংসার বিষবাষ্প দানা বাঁধতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে তা তওবা ও দোয়ার পানি দিয়ে নিভিয়ে ফেলতে হবে। আসুন, অন্যের অর্জনে আনন্দিত হতে শিখি, নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি এবং নির্মল-হিংসাহীন এক পবিত্র হৃদয় নিয়ে মহান রবের দরবারে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করি। আমিন।

