সুখে-দুঃখে আল্লাহর প্রতি ধ্যান রাখার বরকত ও ফজিলত
Advertisement
মুহাম্মাদ রুহুল্লাহ শাজুলি
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষের এক চিরন্তন স্বভাব হলো— যখন সে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, তখন নিজের অহমিকা ও ব্যস্ততায় মহান রবকে ভুলে যায়। আর যখন জীবনের আকাশে কোনো বিপদ বা মুসিবতের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে, তখন সে ব্যাকুল হয়ে রবের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অথচ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সেই বান্দা সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও মর্যাদাবান, যে সচ্ছলতা ও সুখের দিনগুলোতেও সমানভাবে তার ইবাদত করে এবং তাকে স্মরণ রাখে।
আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে, সুখের দিনে আল্লাহর সঙ্গে গড়ে তোলা গভীর সম্পর্কই বিপদের দিনে মানুষের জন্য অদৃশ্য ঢাল হয়ে কাজ করে। সুসময়ের ইবাদত কেবল রবের শুকরিয়া আদায় নয়, বরং এটি দুর্দিনের জন্য সঞ্চিত এক অক্ষয় পুঁজি। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়— সুখের দিনে আল্লাহর হাত ধরা মানেই বিপদ-আপদের মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্রুত সাহায্যে নিশ্চিত হওয়া।
১. বিপদে জবাব পাওয়ার চাবিকাঠি: সচ্ছলতার দোয়া
সুখের সময়ে আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা যে কত বড় মুক্তির কারণ, সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক অনন্য মূলনীতি ঘোষণা করেছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَسْتَجِيبَ اللَّهُ لَهُ عِنْدَ الشَّدَائِدِ وَالْكُرَبِ فَلْيُكْثِرِ الدُّعَاءَ فِي الرَّخَاءِ
‘যে লোক বিপদাপদ ও সংকটের সময় আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ লাভ করতে চায় সে যেন সুখ-স্বাচ্ছন্দের সময় বেশি পরিমাণে দুআ করে।’ (তিরমিজি ৩৩৮২, মুস্তাদরাকে হাকেম ১৮০২)
২. সুখের দিনে দোয়া কেন এত জরুরি?
স্বাচ্ছন্দ্য ও সচ্ছলতার সময়ে মানুষ যখন কোনো চাওয়া ছাড়াই আল্লাহর দরবারে হাত পাতে, তখন তা তার খাঁটি ইখলাস ও বিশ্বাসের প্রমাণ দেয়। এর মাধ্যমে বান্দা প্রমাণ করে যে, সে নিজের সম্পদ বা ক্ষমতার পূজা করে না, বরং একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করে। এই চিরন্তন সত্যটি তুলে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে অত্যন্ত মূল্যবান একটি উপদেশ দিয়েছিলেন—
تَعَرَّفْ إِلَى اللَّهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ
‘তুমি স্বচ্ছলতার সময়ে আল্লাহকে চিনে রাখো (স্মরণ করো), তিনি বিপদের সময়ে তোমাকে চিনবেন (অর্থাৎ তোমার সাহায্য করবেন)।’ (মুসনাদে আহমদ ২৮০৩, মুস্তাদরাকে হাকেম ৬৩০৩)
৩. কুরআনের আলোয় দুই বিপরীত চিত্র
সুখের দিনের আমল কীভাবে বিপদের দিনে কাজে আসে, পবিত্র কুরআনে তার অত্যন্ত শিক্ষণীয় দুটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
ক. ইউনুস (আ.)-এর ইতিবাচক উদাহরণ
মাছের পেটে অতল জলের নিচে ঘোর বিপদের মুখে পড়ে ইউনুস (আ.) যখন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছিলেন, তখন আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু কেন? এর উত্তর স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এভাবে দিয়েছেন—
فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
‘সে যদি (আগে থেকেই) আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণাকারীদের (তাসবিহ পাঠকারীদের) অন্তর্ভুক্ত না হতো, তবে সে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থেকে যেত।’ (সুরা সাফফাত: আয়াত ১৪৩-১৪৪)
অর্থাৎ, সুদিনের নিয়মিত ইবাদত ও জিকিরই দুর্দিনে তার মুক্তির একমাত্র উসিলা হয়েছিল।
খ. ফেরাউনের নেতিবাচক উদাহরণ
অন্যদিকে, ফেরাউন সারাজীবন ক্ষমতা ও অহংকারে মত্ত থেকে আল্লাহকে সম্পূর্ণ ভুলে ছিল। কিন্তু লোহিত সাগরে যখন তার ডুব মরার উপক্রম হলো, তখন সে তওবা ও ঈমান আনার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু বিপদের মুখে তার সেই কান্নাকাটি আল্লাহ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন—
آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفسِدِينَ
‘এখন (ঈমান আনছ)? অথচ এর আগে তো তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং তুমি ছিলে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউনুস: আয়াত ৯১)
মুমিনের করণীয়: মৌসুমী ইবাদত থেকে মুক্ত হওয়া
আমরা যেন কখনো কেবল দুর্দিনের মোহিত বা মৌসুমি ইবাদতকারী না হই। সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় রবের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে। সুখের দিনে আমাদের করণীয়গুলো হলো—
> শোকরগুজার হওয়া: সুস্থতা, শান্তি ও প্রাচুর্য পেলে বারবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা এবং এই নিয়ামত যেন অক্ষুণ্ণ থাকে সেই প্রার্থনা করা।
اَلْحَمْدُ لله
উচ্চারণ: ‘আলহামদুলিল্লাহ।’
অর্থ: ‘সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য।’
اَسْتَغْفِرُ الله
উচ্চারণ: ‘আসতাগফিরুল্লাহ।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

