নারী-পুরুষের পর্দার ধরন কি এক, নাকি ভিন্নতা আছে?
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পর্দা ইসলামের একটি অবশ্যকরণীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সমাজে পর্দার বিধান লঙ্ঘনের কারণে অবক্ষয়, অশ্লীলতা এবং বিভিন্ন নৈতিক অবনতি ঘটে। তবে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, পর্দা কেবল নারীদের জন্য, পুরুষদের এতে কোনো দায় নেই। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দা ফরজ করা হয়েছে, যদিও উভয়ের পর্দার ধরন ও কার্যপরিধিতে ব্যবহারিক কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
পর্দার মূল ধারণা ও নারী-পুরুষের ভিন্নতা
পর্দার বিধান নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হলেও এর প্রয়োগপদ্ধতিতে তফাত রয়েছে।
- পুরুষের পর্দা: পুরুষদের জন্য বোরকা বা বিশেষ আবরণ দিয়ে শরীর ঢাকার বিধান নেই। বরং তাদের পর্দা হলো দৃষ্টি ও মনকে সংযত রাখা, পরনারীর দিকে না তাকানো এবং বেগানা নারীর ঘরে হুটহাট প্রবেশ না করা।
- নারীর পর্দা: নারীরা সাধারণত ঘরের ভেতরে বেশি থাকেন এবং বাইরে বের হলে বোরকা, চাদর বা উপযুক্ত আবরণের মাধ্যমে নিজেদের পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষ উভয়কেই প্রথমে দৃষ্টি সংযত ও লজ্জাস্থান হেফাজত করার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْظْنَ فُرُوجَهُنَّ
‘(হে নবী!) আপনি ইমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত। আর ইমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩০-৩১)
এই আয়াতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা পুরুষদের কথাই আগে উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে দৃষ্টির হেফাজত ও পর্দার ক্ষেত্রে পুরুষের দায়িত্বও কম নয়।
দৃষ্টির হেফাজত এবং চোখের পাপ
ইচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাত বা তাকানোই হলো মূলত যৌন প্রবৃত্তির সূচনা, যার শেষ পরিণতি হতে পারে জিনা-ব্যভিচারের মতো ভয়াবহ পাপ। রাসুলুল্লাহ (সা.) অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যভিচারের কথা বলতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন—
العَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاستِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ، وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أَوْ يُكَذِّبُهُ
‘চোখের জেনা হলো (বেগানা রূপের দিকে) তাকানো, কানের জেনা হলো শোনা, জিবের জেনা হলো কথা বলা, হাতের জেনা হলো ধরা, পায়ের জেনা হলো হেঁটে (পাপের দিকে) অগ্রসর হওয়া, আর মন আকাঙ্ক্ষা ও কামনা করে— এরপর লজ্জাস্থান তা সত্যে পরিণত করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।’ (বুখারি ৬২৪৩, মুসলিম)
দৃষ্টির সংযম রক্ষায় হজরত আলী (রা.)-কে উদ্দেশ করে নবীজি (সা.) বলেছেন—
يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
‘হে আলী! দৃষ্টির ওপর দৃষ্টি ফেলো না। অনিচ্ছাকৃত প্রথম দৃষ্টির জন্য তুমি ক্ষমা পাবে, কিন্তু পরবর্তী (ইচ্ছাকৃত) দৃষ্টির জন্য ক্ষমা পাবে না।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ ২১৬২)
বেগানা নারীর প্রতি কুনজর দেওয়ার পরিণতির বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—
مَنْ مَلَأَ عَيْنَيْهِ حَرَامًا مَلَأَ اللَّهُ عَيْنَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَارًا
‘যে ব্যক্তি কোনো বেগানা নারীর সৌন্দর্যের প্রতি কুদৃষ্টি দিয়ে চোখ ভরে নেয়, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার চোখে আগুন (অথবা সিসা) ভর্তি করে দেবেন।’ (ফাতহুল কাদির)
মাহরাম, গায়রে মাহরাম এবং মেলামেশার সীমারেখা
ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম, তারা হলো ‘মাহরাম’ এবং যাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ, তারা ‘গায়রে মাহরাম’ বা বেগানা। বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা পর্দাহীন দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ।
অপরিচিত বা বেগানা নারীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কুরআনের নির্দেশনা হলো—
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
‘আর তোমরা যখন তাদের (নবীপত্নীদের বা নারীদের) কাছে কোনো জিনিস চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে বাইরে দাঁড়িয়ে চাইবে। এ নীতি তোমাদের ও তাদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার পক্ষে অধিকতর উপযোগী।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৩)
পরস্পরের নির্জনবাস ও মেলামেশার বিপদ সম্পর্কে নবীজি (স.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন—
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
‘যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে একান্তে থাকে, তখনই তাদের মধ্যে তৃতীয় হিসেবে শয়তান এসে অনুপ্রবেশ করে।’ (তিরমিজি ২১৬৫)
পর্দার বিধান পালনের গুরুত্ব বোঝাতে উম্মুল মুমিনিন হজরত উম্মে সালমা (রা.) ও মাইমুনা (রা.)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে আসার সময় নবীজি তাঁদের পর্দা করার নির্দেশ দেন। তারা বললেন, ‘তিনি তো অন্ধ, আমাদের দেখতে পাবেন না।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাবে বললেন, ‘তোমরা দুজনও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছ না?’ (আবু দাউদ ৪১১২)
পর্দার সর্বজনীন পরিধি ও যৌথ দায়িত্ব
পর্দার বিধান কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর বহুমুখী পরিধি রয়েছে—
সতর রক্ষা: নারীদের আপাদমস্তক এবং পুরুষদের কমপক্ষে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ঢেকে রাখা আবশ্যক।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: পরিবারের প্রধান হিসেবে অধীনস্থদের পর্দা ও শালীনতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এর পরিবেশ নিশ্চিত করা পুরুষের অন্যতম দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা মানুষের গোপন ও প্রকাশ্য সব অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবহিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ
‘চোখগুলোর চোরা তাকানো এবং অন্তর যা গোপন করে, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা গাফির: আয়াত ১৯)
সংক্ষেপে বলা যায়, পর্দা কেবল নারীর একাই পালনীয় কোনো বিধান নয়; বরং নারী ও পুরুষ উভয়ের যৌথ ও সমান দায়িত্ব। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পর্দার বিধান যথাযথভাবে মেনে চলা মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। আসুন, নারী-পুরুষ উভয়েই শরিয়তের এই সুমহান বিধান মেনে চলার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পবিত্র করি এবং একটি সুন্দর, নৈতিকতা সম্পন্ন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি।

